
উৎসব
ভাইফোঁটা ২০২৬: তারিখ, তিথি আর যমের দুয়ারে কাঁটার ছড়া
ভাইফোঁটা এবার বুধবার, ১১ নভেম্বর। দুই পঞ্জিকায় দ্বিতীয়া কখন লাগছে, কখন ছাড়ছে, ফোঁটা দেওয়ার ভালো সময় কোনটা, সব এক জায়গায়। সাথে ফোঁটার নিয়ম আর যমের দুয়ারে কাঁটা পড়ার সেই ছড়াটাও।
এই লেখায় (৫)
ছোট্ট বাটিতে চন্দন বাটা। থালায় ক’টা ধান আর দূর্বা, হাতের কাছে শাঁখ। ভাই কপাল বাড়িয়ে বসে, বোনের অনামিকা চন্দনে ডোবানো। একবার, দু’বার, তিনবার।
দেখে মনে হবে আদরের উৎসব। আদরের তো বটেই। তবু ফোঁটা দিতে দিতে বোন মুখে কী বলছেন, একবার কান পেতে শুনুন। ছড়াটা আদরের নয়, পাহারার। পাহারাটা যমের দুয়ারে।
ভাইফোঁটা ২০২৬ কবে পড়ছে
ভাইফোঁটা এবার পড়ছে বুধবার, ১১ নভেম্বর ২০২৬, বাংলা হিসেবে ২৫ কার্তিক ১৪৩৩। কালীপুজো রবিবার, ৮ নভেম্বর, ফোঁটা তার ঠিক তিন দিন পরে। দিন নিয়ে কলকাতার দুই পঞ্জিকায় কোনও তর্ক নেই।
দৃকপঞ্জিকার কলকাতার পাতা বলছে, দ্বিতীয়া লাগছে মঙ্গলবার, ১০ নভেম্বর দুপুর ২টোয়, ছাড়ছে বুধবার, ১১ নভেম্বর বিকেল ৩টে ৫৩ মিনিটে। বিশুদ্ধ সিদ্ধান্ত পঞ্জিকায় দুই মাথাই এক মিনিট করে পরে, ২টো ১ থেকে ৩টে ৫৪। তিথি লাগছে মঙ্গলবার, অথচ ফোঁটা বুধবার। কারণটা বিশুদ্ধ সিদ্ধান্তের পাতাতেই লেখা: এই দ্বিতীয়া মানা হয় উদয়া তিথির নিয়মে। যেদিন সূর্য ওঠার সময় তিথি চলছে, গোনা হয় সেই দিনটাই। মঙ্গলবার ভোরে দ্বিতীয়া লাগেনি। বুধবার ভোরে দিব্যি চলছে।
ফোঁটা ঠিক ক’টায় দেবেন? দৃকপঞ্জিকা হিসেব করেছে অপরাহ্ণ ধরে, দুপুর ১২টা ২৭ থেকে ২টো ৪১। বিশুদ্ধ সিদ্ধান্তের পাতায় ফোঁটার আলাদা কোনও সময় নেই, আছে শুধু দিনের সাধারণ শুভ সময়। কোন বাড়ি কোন ঘড়ি মানবে, সেটা সে বাড়ির ঠাকুমার এক্তিয়ার। আমরা তাতে নাক গলাব না। তবে একটা কথা কাঁটায় কাঁটায় মানতেই হবে: তিথি ছাড়ার আগে ফোঁটা সারা চাই। দৃকপঞ্জিকায় সেটা বিকেল ৩টে ৫৩, বিশুদ্ধ সিদ্ধান্তে ৩টে ৫৪। তার পরে দ্বিতীয়া আর নেই।
| দৃকপঞ্জিকা | বিশুদ্ধ সিদ্ধান্ত | |
|---|---|---|
| দিন | বুধবার, ১১ নভেম্বর | বুধবার, ১১ নভেম্বর (২৫ কার্তিক ১৪৩৩) |
| দ্বিতীয়া লাগছে | মঙ্গলবার, ১০ নভেম্বর, দুপুর ২টো | মঙ্গলবার, ১০ নভেম্বর, দুপুর ২টো ১ |
| দ্বিতীয়া ছাড়ছে | বুধবার, ১১ নভেম্বর, বিকেল ৩টে ৫৩ | বুধবার, ১১ নভেম্বর, বিকেল ৩টে ৫৪ |
| ফোঁটার সময় | দুপুর ১২টা ২৭ থেকে ২টো ৪১ (অপরাহ্ণ) | আলাদা করে দেওয়া নেই |
যমের দুয়ারে কাঁটা
দিনটার আরেক নাম যমদ্বিতীয়া, আর সে নামের পিছনে আছে একটা নেমন্তন্ন। কাহিনি বলে, এই দ্বিতীয়ায় মৃত্যুর দেবতা যম বোন যমুনার ডাকে তাঁর বাড়ি খেতে গিয়েছিলেন। ফেরার আগে বর দিয়ে এলেন: এই তিথিতে যে ভাই বোনের বাড়ি গিয়ে খাবে, অকালমৃত্যুর ভয় তার থাকবে না। খোদ যমরাজ বোনের বাড়িতে পাত পেড়ে খাচ্ছেন, ছবিটা ভাবলে ভয়ের চেয়ে মায়াই বেশি লাগে। গল্পটা এভাবেই বলেছে বাংলা উইকিপিডিয়া, দৃকপঞ্জিকার পাতাতেও তাই।
এবার ছড়াটা। চন্দনে আঙুল ছুঁইয়ে, ভাইয়ের কপালে ফোঁটা দিতে দিতে বোন বলেন:
শুনতে ছড়া, আসলে মন্ত্র। যে অতিথিকে কেউ ডাকে না, তার মুখের উপর দরজায় খিল তুলে দেওয়া। লম্বা ছড়াটা বাড়ি বাড়ি বদলায়, তবে বাংলা উইকিপিডিয়ার পাঠে কথাটা আরও খোলাখুলি। চেনা দুই চরণের ঠিক পরেই আসে ‘যমুনা দেয় যমকে ফোঁটা’, আর শেষ হয় ‘আমার ভাই হোক অমর’-এ। মাঝখানের হিসেব সোজা: যমুনার ফোঁটায় যম অমর হয়েছেন, তাই আমার ফোঁটায় আমার ভাইও অমর হোক। বছরে এক সকালে বাংলা জুড়ে মেয়েরা স্পষ্ট ভাষায় চেয়ে নেন, ভাই যেন না মরে। কথাটা এত সোজা বলেই বুকে বেঁধে। পাহারাটা তাই যমের দুয়ারেই।
ফোঁটা দেওয়ার নিয়ম
খুঁটিনাটিতে এক বাড়ির সাথে আরেক বাড়ির মেলে না। বাংলা উইকিপিডিয়া নিয়মটা যে ক্রমে লিখেছে, সেটাই নীচে রইল।
- বোন জল দিয়ে চন্দন বেটে নেন। কেউ কেউ তাতে দইও মেশান।
- অনামিকা দিয়ে ভাইয়ের কপালে তিনবার ফোঁটা দেন, সাথে ছড়াটা বলেন।
- তারপর ভাইয়ের মাথায় ধান আর দূর্বা রাখেন। শাঁখ বাজে, উলু পড়ে।
- বোন বড় হলে ভাইকে আশীর্বাদ করেন। ছোট হলে প্রণাম করেন, ভাই আশীর্বাদ করেন।
- শেষে মিষ্টিমুখ, তারপর দু’তরফে উপহার দেওয়া-নেওয়া।
সাত ভাই চম্পা আর পারুল
বাংলায় ভাই-বোনের গল্প আরও একটা আছে, যদিও ভাইফোঁটার সাথে তার কোনও যোগ নেই। ‘সাত ভাই চম্পা’ ছাপার অক্ষরে আসে ১৯০৭ সালে, দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদারের ‘ঠাকুরমার ঝুলি’-তে। বইটার ভূমিকা লিখেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। হিংসুটে রানিরা সাত ভাইকে মাটিতে পুঁতে দেয়। তারা ফিরে আসে সাতটা চাঁপা ফুল হয়ে, বোন ফেরে পারুল ফুল হয়ে। কয়েকটি পাঠে পারুলই কথা বলে চাঁপা ভাইদের সাথে। শেষে ফুলেরা ধরা দেয় শুধু তাদের দুখিনী মায়ের হাতে। নানা পাঠ পাশাপাশি পাবেন উইকিপিডিয়ায় গল্পটার পাতায়।
ডাকটা বইয়ের মলাট ছাড়িয়ে গানেও ঢুকেছে। ‘সাত ভাই চম্পা জাগো রে’, এই পুরোনো গানটার নামেই সেই ডাক। ভাইফোঁটার সকালে বোনেরাও তো ঘুরিয়ে সেই কথাই বলেন: জেগে থাকো, বেঁচে থাকো।
৩:১৬সাত ভাই চম্পা জাগো রে
90s Kid Prime
রূপকথার সেই ডাক, এবার সুরে। মিনিট সোয়া তিনেকের গান, পাবেন পুরোনো গানের মুডে।
বঙ্গভঙ্গের বছরে লাল সুতো
১৯০৫ সাল, বঙ্গভঙ্গ। সেবার ভাই-বোনের বাঁধনটা রবীন্দ্রনাথ ঘরের বাইরে নিয়ে এলেন, দুই সম্প্রদায়ের মাঝখানে। হিন্দু আর মুসলমান একে অপরের কবজিতে লাল সুতো বেঁধে ভাই পাতালেন। উইকিপিডিয়ার ‘ভাই দুজ’ পাতা গবেষক র্যাচেল ফেল ম্যাকডারমটের পাঠটা তুলে দিয়েছে। তাঁর চোখে রবীন্দ্রনাথ ভাইফোঁটার প্রতীকটাকেই হিন্দু-মুসলমানের বন্ধুত্ব পর্যন্ত ছড়িয়ে দিয়েছিলেন। সুতোর নাম রাখি, ভাবনাটা কিন্তু এসেছিল ভাইফোঁটার থালা থেকে।
বুধবার বিকেল ৩টে ৫৩-র মধ্যে ফোঁটা পড়ে গেলে পাহারার কাজ শেষ। তারপর মিষ্টিমুখ, তারপর দুপুরের খাওয়া। খাওয়ার পর অনেকক্ষণ কেউ নড়েন না, এটাও বোধহয় নিয়মের মধ্যেই পড়ে। সেই দুপুরে চালিয়ে দিন আড্ডার মুড। কালীপুজোর গান এখনও কানে লেগে থাকলে তিন রাত আগের গানগুলো পাবেন কালীপুজো ২০২৬ লেখায়।
তথ্যসূত্র (৪)
- Bhai Dooj 2026, Kolkata, দৃকপঞ্জিকা। দেখা হয়েছে ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬।
- ভাইফোঁটা, বাংলা উইকিপিডিয়া। দেখা হয়েছে ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬।
- Bhai Dooj, উইকিপিডিয়া। দেখা হয়েছে ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬।
- Saat Bhai Champa, উইকিপিডিয়া। দেখা হয়েছে ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬।
মুড কলকাতাকে ফলো করুন
এমন লেখা, নতুন গল্প আর গান এলেই খবর পাবেন।


