
উৎসব
জগদ্ধাত্রী পুজো ২০২৬: নবমী বৃহস্পতিবার, চন্দননগর আর কৃষ্ণনগরের দেবী
নবমী তিথির প্রায় পুরোটা বুধবারে, অথচ জগদ্ধাত্রী পুজোর নবমী বৃহস্পতিবার, ১৯ নভেম্বর। কেন, তার উত্তর দুই পঞ্জিকার তিথিতেই। সঙ্গে চন্দননগর আর কৃষ্ণনগরের ইতিহাস, দুই শহর দেবীকে আপন করেছে দুই রকমে।
এই লেখায় (৫)
সারা বছর চন্দননগর বলতে গঙ্গার ধারের পুরোনো ফরাসি শহর, তার স্ট্র্যান্ড আর গির্জা। নভেম্বরে নামটার মানে বদলে যায়। আলো। আর সিংহের পিঠে বসা এক দেবী, তার থাবার নীচে একটা হাতি। চারপাশে গোটা শহর ঘুরছে, আর দেবী বসে আছেন স্থির হয়ে।
কালীপুজোর এগারো দিন পরে দেবী আবার আসেন, এবার শান্ত রূপে। কালীর রাত অন্ধকার, শব্দে ভরা। জগদ্ধাত্রী নামের অর্থ, যিনি জগৎকে ধারণ করে আছেন। প্রতিমা দেখলেও সেটাই মনে হয়। চার হাতে তিনি বসে আছেন, কোনও তাড়া নেই। এই দেবীকে আপন করে নিয়েছে দুটো শহর, গঙ্গার ধারে হুগলির চন্দননগর আর নদিয়ার কৃষ্ণনগর। দুই শহরের পুজো দুই রকম। আর এ পুজো প্রথম কার হাতে, রাজার না তারও আগের কারও, সে তর্ক আজও মেটেনি।
জগদ্ধাত্রী পুজো ২০২৬ কবে পড়ছে
জগদ্ধাত্রী পুজো, মানে নবমীর মূল পুজো, এবার পড়ছে বৃহস্পতিবার, ১৯ নভেম্বর ২০২৬। দৃকপঞ্জিকার কলকাতার হিসেব এই দিনটাই দিয়েছে। বিশুদ্ধ সিদ্ধান্ত পঞ্জিকাও বৃহস্পতিবারকেই ধরেছে। যাঁরা সপ্তমী থেকে পুজো ধরেন, তাঁদের জন্য সেখানে আগের দিনগুলোও আছে: সপ্তমী সোমবার, ১৬ নভেম্বর, অষ্টমী মঙ্গলবার, ১৭ নভেম্বর। খটকা লাগে তিথি দেখলে। নবমী তিথির প্রায় পুরোটাই বুধবারে। লাগছে ১৮ নভেম্বর ভোর ৬টা ৪ মিনিটে, ছাড়ছে ১৯ নভেম্বর সকাল ৭টা ৫ মিনিটে। বুধবার সূর্য উঠছে ভোর ৫টা ৫১-য়, অষ্টমী ছাড়তে তখনও তেরো মিনিট বাকি। দৃকপঞ্জিকায় বৃহস্পতিবারের পঞ্চাঙ্গ বলছে, সেদিন সূর্য উঠছে ৫টা ৫২-য়, নবমী তখনও চলছে। হিসেবটা চলে সূর্যোদয়ের নিয়মে। বিশুদ্ধ সিদ্ধান্তের পাতায় নিয়মটার নামও লেখা আছে। সূর্য যে তিথিতে ওঠে, দিনটা সেই তিথির। বৃহস্পতিবার সূর্য ওঠার পর নবমী টেকে মোটে ঘণ্টাখানেক, তবু গোটা দিনটা তারই। আর তিথির প্রায় পুরোটা বুকে নিয়েও বুধবার থেকে যায় অষ্টমীর খাতায়।
| দিন | সূর্যোদয়ে তিথি | কী |
|---|---|---|
| সোমবার, ১৬ নভেম্বর | সপ্তমী (বিশুদ্ধ সিদ্ধান্ত) | সপ্তমী থেকে ধরা পুজোর শুরু |
| মঙ্গলবার, ১৭ নভেম্বর | অষ্টমী (ভোর ৪টে ১৯ থেকে, বিশুদ্ধ সিদ্ধান্ত) | কয়েক দিনের পুজো চলছে |
| বুধবার, ১৮ নভেম্বর | অষ্টমী, ভোর ৬টা ৪ পর্যন্ত (দৃকপঞ্জিকা) | ভোর ৬টা ৪-এ নবমী লাগছে |
| বৃহস্পতিবার, ১৯ নভেম্বর | নবমী, সকাল ৭টা ৫ পর্যন্ত (দৃকপঞ্জিকা) | নবমীর পুজো, এক দিনের পুজো এদিনই |
| শুক্রবার, ২০ নভেম্বর | দশমী, সকাল ৭টা ১৬ পর্যন্ত (বিশুদ্ধ সিদ্ধান্ত) | বিসর্জন, বিশুদ্ধ সিদ্ধান্ত পঞ্জিকা মতে |
উইকিপিডিয়ায় জগদ্ধাত্রী পুজোর পাতা জানাচ্ছে, কোথাও এই পুজো কয়েক দিনের, কোথাও শুধু নবমীর। চন্দননগর প্রথম দলে। সেখানে কোন কোন দিন পুজো হবে, শোভাযাত্রা কবে বেরোবে, প্রতি বছর ঠিক করে কেন্দ্রীয় কমিটি। এ বছরের সূচি এখনও ঘোষণা হয়নি।
কে আগে: রাজার কাহিনি, না মন্দিরের দেওয়াল
কৃষ্ণনগরে গেলে গল্পটা শুনবেনই। কথিত আছে, খাজনা বাকি পড়ায় নবাব আলিবর্দি খাঁ নদিয়ার রাজা কৃষ্ণচন্দ্রকে আটকে রেখেছিলেন। ছাড়া পেলেন বিজয়া দশমীর দিন, বাড়ির দুর্গাপুজো ততক্ষণে শেষ। ফেরার পথে মন ভার, আর সেই পথেই দেবী তাঁকে দেখা দিলেন অন্য এক রূপে। রাজধানীতে ফিরে শুরু করলেন সেই রূপের পুজো। উইকিপিডিয়ায় জগদ্ধাত্রীর পাতা একে প্রচলিত কাহিনি বলেই লিখেছে। বাংলা উইকিপিডিয়া নবাবের দাবির অঙ্কটাও দিয়েছে: বারো লক্ষ টাকা।
পুরোনো সাক্ষীরা অবশ্য অন্য কথা বলে। শূলপাণির ‘কালবিবেক’-এই কার্তিক মাসের জগদ্ধাত্রী পুজোর উল্লেখ আছে। বইটা লেখা ১৩৭৫ থেকে ১৪৬০-এর মধ্যে কোনও এক সময়ে। হুগলির সোমড়ায় জগদ্ধাত্রীর মন্দির ১৬২১ সালের। শান্তিপুরের জলেশ্বর মন্দির ১৬৬৫-র, রাঘবেশ্বর মন্দির ১৬৬৯-এর। দুটোরই গর্ভগৃহে আর দেওয়ালে দেবী আগে থেকেই আছেন। কাজেই জগদ্ধাত্রীকে কৃষ্ণচন্দ্র খুঁজে আনেননি। আঠারো শতকে তিনি যা করলেন, সেটা অন্য কাজ: দেবীকে একটা গোটা শহরের দেবী করে তোলা।
কৃষ্ণনগর: রাজবাড়ি থেকে চাষাপাড়ায়
১৭৭২ সাল। দুই উইকিপিডিয়াতেই সালটা এক। রাজবাড়ির পুজো দেখে চাষাপাড়ায় কৃষ্ণচন্দ্রের প্রজারা নিজেদের জগদ্ধাত্রী পুজো শুরু করেন। বাংলা উইকিপিডিয়ার বিবরণে, খরচ জোগাতেন পাড়ার গোয়ালারা, দুধ বেচার টাকা থেকে। প্রথমে প্রতিমা ছিল না, পুজো হত ঘটে আর পটে। ১৭৯০ নাগাদ গোবিন্দ ঘোষের হাতে পুজো পায় পুরো প্রতিমা। আজ সেই দেবীর নাম বুড়িমা, আর ইংরেজি উইকিপিডিয়ার মতে শহরের সবচেয়ে জনপ্রিয় জগদ্ধাত্রী তিনিই। ওই পাতাই আরও তিনজনের নামডাকের কথা লিখেছে: কাঁঠালপোতার ছোট মা, কলেজ স্ট্রিটের মেজো মা আর মালোপাড়ার মা জলেশ্বরী।
রাজার শহরে বুড়িমার পুজো চলত রাজবাড়ির টাকায় নয়, চাষাপাড়ার গোয়ালাদের টাকায়। কথাটা আমাদের ভারী ভালো লাগে। বাংলার পার্বণ বরাবর এই পথেই বেড়েছে। শুরু রাজবাড়িতে, তারপর একদিন পাড়া সেটাকে নিজের করে নেয়।
কৃষ্ণনগর
নদিয়া
রাজার কাহিনির শহর, আর ১৭৭২ সাল থেকে চাষাপাড়ার বুড়িমার।
- কলকাতা থেকে
- শিয়ালদা থেকে কৃষ্ণনগর সিটি জংশনের লোকাল ট্রেন
- নবমী
- বৃহস্পতিবার, ১৯ নভেম্বর ২০২৬
চন্দননগর: যে শহর একসময় ফরাসি ছিল
চন্দননগর ফরাসি ছিল গত শতকের মাঝামাঝি পর্যন্ত। উইকিপিডিয়ায় চন্দননগরের পাতা পরপর তিনটে সাল দিয়েছে। ১৯৪৯ সালের গণভোটে শহর ভারতে যোগ দেওয়ার পক্ষে রায় দেয়। হস্তান্তর হয় পরের বছর, ১৯৫০-এ। আর ১৯৫৪ সালের ২ অক্টোবর চন্দননগর মিশে যায় পশ্চিমবঙ্গে। ইংরেজি উইকিপিডিয়া বলছে, এখানকার উৎসবের চেহারাটা ফরাসি আর বাঙালি মিলে গড়া।
আজ চন্দননগরকে লোকে চেনে পুজোর বহর আর আলো দিয়ে। বাংলা উইকিপিডিয়ার হিসেবে কেন্দ্রীয় কমিটির স্বীকৃত পুজো তিনশোর বেশি। তার মধ্যে ৭৫ থেকে ৮০টি পুজো প্রতি বছর শোভাযাত্রায় বেরোয়। কারা যাবে, ঠিক হয় লটারিতে। সেই শোভাযাত্রার আলোর জাঁকের কথা উইকিপিডিয়াও লিখেছে। দূর থেকে লোকে আসে ওই আলো দেখতেই।
চন্দননগর
হুগলি, গঙ্গার ধারে
এখানে পুজো কয়েক দিনের, সঙ্গে আলোর শোভাযাত্রা। সব চালায় কেন্দ্রীয় কমিটি, শোভাযাত্রায় কোন পুজো যাবে ঠিক হয় লটারিতে। ২০২৬-এর দিন আর শোভাযাত্রার তারিখ এখনও ঘোষণা হয়নি।
- কলকাতা থেকে
- হাওড়া মেন লাইনের লোকাল ট্রেনে চন্দননগর
- ২০২৬-এর সূচি
- কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষণা করবে
মা যেমন ছিলেন
জগদ্ধাত্রীর একটা বিখ্যাত পরিচয় কোনও স্তোত্রে মিলবে না। সেটা আছে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের উপন্যাস ‘আনন্দমঠ’-এ। ভারত ‘বন্দে মাতরম্’ পেয়েছে এই বই থেকেই। উপন্যাসের সন্ন্যাসীরা দেশমাতার পুজো করেন তিন মূর্তিতে। জগদ্ধাত্রী, মা যেমন ছিলেন। কালী, মা এখন যেমন। দুর্গা, মা যেমন হবেন। উইকিপিডিয়ায় দেবীর পাতা তিন মূর্তির কথা এভাবেই সাজিয়েছে।
এই কথাটা মনে রেখে পুজোর ক্যালেন্ডারে চোখ বোলান। একটা অদ্ভুত মানে দাঁড়ায়। অক্টোবরে দুর্গা আসেন, সব আশা নিয়ে। কালী আসেন সবচেয়ে অন্ধকার রাতে, যা আছে তা-ই নিয়ে। তার এগারো দিন পরে হাওয়া ঘুরে গেছে, মাঠের ধান উঠে গেছে, আর বাংলা তখন মনে করে আরও আগের এক মাকে। সেই মা শুধু জগৎটাকে স্থির করে ধরে রাখেন। জয়রামবাটিতে সারদা দেবীর জন্মভিটেয় জগদ্ধাত্রী পুজোর দিনে আজও পুজো হয়, শুরু করেছিলেন তাঁর মা। বাংলা উইকিপিডিয়ার হিসেবে প্রথম পুজো ১৮৭৭ সালে, যদিও সারদা দেবীর জীবনীকার সালটা নিয়ে নিশ্চিত ছিলেন না। সেই পুজো এখন চালায় রামকৃষ্ণ মিশন।
১:০৩:৫৪শুনুন: রক্ষাকর্ত্রী জগদ্ধাত্রীরক্ষাকর্ত্রী জগদ্ধাত্রী
Akashvani Kolkata
শিরোনামেই দেবীর নাম। গল্পটা ঐতিহাসিক, তাতে ভয় আছে, খুনের রহস্যও। ইউটিউবে ‘আকাশবাণী কলকাতা’ চ্যানেলে আছে, চলে ১ ঘণ্টা ৪ মিনিট।
গান শুনতে চাইলে পুজোর মুড অক্টোবর থেকে চলছে, এখনও থামেনি। আগের দুটো পার্বণের লেখা পড়া না হয়ে থাকলে দেখে নিন কালীপুজো ২০২৬ আর তার তিন দিন পরের ভাইফোঁটা।
তথ্যসূত্র (৬)
- Jagaddhatri Puja 2026, Kolkata, দৃকপঞ্জিকা। দেখা হয়েছে ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬।
- Day Panchang, 19 November 2026, Kolkata, দৃকপঞ্জিকা। দেখা হয়েছে ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬।
- Jagaddhatri Puja, উইকিপিডিয়া। দেখা হয়েছে ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬।
- Jagaddhatri, উইকিপিডিয়া। দেখা হয়েছে ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬।
- জগদ্ধাত্রী, বাংলা উইকিপিডিয়া। দেখা হয়েছে ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬।
- Chandannagar, উইকিপিডিয়া। দেখা হয়েছে ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬।
মুড কলকাতাকে ফলো করুন
এমন লেখা, নতুন গল্প আর গান এলেই খবর পাবেন।


