
বেড়ানো
সিটং (Sittong): কার্শিয়াংয়ের কাছে কমলালেবুর গ্রাম, কমলা পাকে কখন
সিটংয়ের কমলা আসলে কখন পাকে, এনজেপি থেকে মংপু পেরিয়ে কোন পথে পৌঁছোবেন, অক্টোবরে ওখানে আবহাওয়া কেমন, আর রাজ্যের হোমস্টে নীতিতে অতিথি আর হোমস্টের মালিক, দু পক্ষের কী কী করণীয়।
এই লেখায় (৫)
অক্টোবরে সিটংয়ের কমলা পাকে না। ফল তোলা হয় নভেম্বর থেকে জানুয়ারি। তখনই ঢালে ঢালে রং ধরে, আর ওই রঙের জন্যই গ্রামটার এত নামডাক। মহালয়া এসে গেল, পুজোর ছুটি পড়তে আর এক সপ্তাহ। সিটংয়ের খোঁজখবরও শুরু হয় ঠিক এই সময়ে। তাই গোড়াতেই সোজা কথাটা বলে রাখি: পুজোর ছুটিতে গেলে পাবেন উপত্যকা আর নিরিবিলি, কমলা নয়।
সিটংয়ের কমলা পাকে কখন?
সিটংয়ের কমলা পাকে নভেম্বর থেকে জানুয়ারি। দার্জিলিং পাহাড়ের কমলা নিয়ে একটা গবেষণাতেও ফল তোলার মরসুম এই তিন মাস। আপার সিটংয়ে তোলা ছবিও তাই বলে। নীচের ছবিতে টিনের চালের বাড়ির সামনে পাকা ফলে ভরা গাছ, তারিখ ৯ জানুয়ারি ২০২১। গ্রামের মানুষ কথাটা আরও সোজা করে বলেছেন কেন্দ্রীয় সংস্কৃতি মন্ত্রকের গ্রাম-পরিচিতিতে। সিটংয়ের প্রত্যেক বাড়িতে বাগান, প্রত্যেক বাগানে কমলার গাছ, আর শীতে গোটা গ্রামটাই কমলা হয়ে যায়।

এ সেই ছোট, আলগা খোসার পাহাড়ি কমলা, কলকাতা যাকে দার্জিলিংয়ের কমলা বলে চেনে। শীত পড়লে এই কমলাই পাহাড় থেকে শহরে নামে। ২০২৫ সালের নভেম্বরে ‘দার্জিলিং ম্যান্ডারিন’ নামে এই কমলা ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) তকমা পেয়েছে। ওই নামে এখন বেচতে পারেন শুধু এই পাহাড়ের নথিভুক্ত চাষিরা। উইকিপিডিয়া লিখছে, রাজ্যের সিঙ্কোনা ও অন্যান্য ভেষজ উদ্ভিদ অধিকার ডিসেম্বরে সিটংয়ে কমলা উৎসব করে। এ বছরের তারিখ এখনও ঘোষণা হয়নি।
শুধু কমলার টানেই যদি যান, আমরা বলব ডিসেম্বর। মরসুমের ঠিক মাঝখান, উৎসবও ওই মাসে। নভেম্বর বা জানুয়ারিও চলে, মরসুমের দু মাথায়। দুটোর মধ্যে নভেম্বরে ঠান্ডা কম।
তবু অক্টোবরে গেলে: আবহাওয়ার খাতা কী বলছে
এই পাহাড়ে বৃষ্টি থামে অক্টোবরে। সিটংয়ের নিজের আবহাওয়ার লম্বা কোনও খাতা নেই। সবচেয়ে কাছেরটা দার্জিলিং শহরে, ভারতীয় আবহাওয়া দফতরের কেন্দ্রে। সেখানকার ১৯৯১ থেকে ২০২০ সালের গড়ে বদলটা একেবারে চোখে পড়ার মতো। সেপ্টেম্বরে বৃষ্টি ৩৮৫ মিলিমিটার, ১৬ দিনে। অক্টোবরে ৭৯ মিলিমিটার, ৪ দিনে। নভেম্বরে ১১ মিলিমিটার, বৃষ্টির দিন গড়ে এক দিনেরও কম। সকালগুলোও পরিষ্কার হয়ে আসে। অক্টোবরে গড়ে ১৬.৮টা সকালে দার্জিলিং থেকে ২০ কিলোমিটারের বেশি দূর দেখা যায়, সেপ্টেম্বরে মাত্র ৬.১টায়।
শহরের হিসেব উপত্যকায় খাটাতে গেলে দুটো কথা মাথায় রাখুন। দার্জিলিংয়ের কেন্দ্রটা ২,১২৮ মিটার উঁচুতে। আর উপগ্রহ থেকে মাপা উচ্চতায় মানচিত্রে সিটংয়ের বিন্দুটা ৭০০ মিটারেরও নীচে। ফলে উপত্যকায় শহরের চেয়ে ঠান্ডা কম, সোয়েটার-চাদর সম্ভবত দার্জিলিংয়ের চেয়ে কমই লাগবে। দ্বিতীয় কথা, এই পাহাড়ে ধস নামার বড় কারণগুলোর একটা ভারী বৃষ্টি, আর তার পরেই প্রায়ই রাস্তা বন্ধ হয়। যাওয়ার সপ্তাহে বিদায়ী বর্ষা শেষ ঝাপটা দিলে এনজেপি ছাড়ার আগে হোমস্টের মালিককে ফোন করে জেনে নিন, মংপুর রাস্তা খোলা কি না।
রাস্তা: তিস্তার ধার ধরে, তারপর মংপু পেরিয়ে
ওপেনস্ট্রিটম্যাপের রুট ধরলে নিউ জলপাইগুড়ি থেকে শিলিগুড়ির মুখে এনএইচ১০ ধরে পথ যায় উত্তরে, সেবক পর্যন্ত। সেবক থেকে তিস্তার পাশে পাশে প্রায় ২০ কিমি গেলে রম্বি বাজার। রম্বি থেকে রাস্তা খাড়া বাঁক নিয়ে ওঠে মংপুর দিকে, মংপু পেরিয়ে আবার নামে রিয়াং উপত্যকায়। সিটং উপত্যকা জুড়ে কয়েকটা ভাগে ছড়ানো, তাই হোমস্টে কোন ভাগে পড়ছে, দূরত্ব দাঁড়াবে সেই অনুযায়ী। মানচিত্রে গ্রামের বিন্দু পর্যন্ত এনজেপি থেকে মোটামুটি ৬১ কিমি, কার্শিয়াং থেকে প্রায় ২৬, দার্জিলিং থেকে প্রায় ৩৪। রাস্তা ফাঁকা ধরলে রাউটারের হিসেবে এনজেপি থেকে লাগে ঘণ্টাখানেকের একটু বেশি। পাহাড়ি পথে ওর চেয়ে কম কিছুতেই লাগবে না। গাড়ি বুক করার আগে যাঁদের বাড়িতে উঠছেন, তাঁদের কাছে জেনে নিন এ মরসুমে এনজেপি থেকে গাড়িভাড়া কত।
মংপুর চড়াইয়ে একটু থামবেন। বাংলার কুইনাইন এসেছিল এখান থেকেই। ১৮৬০-এর দশকে এই পাহাড়ে সরকারি সিঙ্কোনা বাগান বসে। আর ১৮৯০-এর দশকের গোড়া থেকে মংপুর কারখানার তেতো গুঁড়ো এক পয়সার মোড়কে বিক্রি হত ডাকঘরে, গ্রামে গ্রামে পৌঁছে দিতেন ডাকহরকরারা। ব্রিটিশ ভারতে সিঙ্কোনা চাষের ইতিহাসে এর বিবরণ আছে। গাঁয়ের ম্যালেরিয়ার ওষুধ আসত ডাকে, এই ঢাল থেকে। উইকিপিডিয়ায় মংপুর পাতা লিখছে, কুইনাইন কারখানার দায়িত্ব যখন মৈত্রেয়ী দেবীর স্বামীর হাতে, সেই ১৯৩৮ থেকে ১৯৪০ রবীন্দ্রনাথ বারবার এসে থেকেছেন ওঁদের বাড়িতে। ওই দিনগুলোর কথা মৈত্রেয়ী দেবী লিখে রেখেছেন ‘মংপুতে রবীন্দ্রনাথ’ বইয়ে, আর বাড়িটা এখন রবীন্দ্র ভবন সংগ্রহশালা। চড়াই ভাঙার সময় এই গানটা চালিয়ে দিন।
৩:২৬মেঘ বলেছে যাব যাব, রূপঙ্কর বাগচী
Times Music Bangla
রবীন্দ্রনাথের গান, ‘আবার কাঞ্চনজঙ্ঘা’ ছবির জন্য গাওয়া। মেঘ বলছে চলে যাবে। বৃষ্টির হিসেব বলছে, অক্টোবরে বেশির ভাগ দিন সত্যিই যায়।
সিটং
দার্জিলিং জেলা, কার্শিয়াং ব্লক, রিয়াং উপত্যকা
পাহাড়ি শহর নয়, পাহাড়ি গ্রাম চাইলে সিটং। কমলার বাগান, নদীর উপত্যকা, পরিবারের হাতে চলা হোমস্টে। ঘুরে ঘুরে দেখার জায়গার ফর্দ ছোট। ফল তোলার মাসে যান কমলার জন্য, অক্টোবরে সবুজ আর নিরিবিলির জন্য। শপিং মল, রোপওয়ে বা রোজ সকালে হোটেলের বারান্দা থেকে ভিউ চাইলে এ জায়গা আপনার জন্য নয়। আমরা হলে এখানে দু রাত থাকতাম, আর আসার পথে মংপুতে আধবেলা কাটাতাম।
- কমলার মরসুম
- নভেম্বর থেকে জানুয়ারি। ডিসেম্বরে কমলা উৎসব (২০২৬-এর তারিখ এখনও ঘোষণা হয়নি)
- রাস্তা
- এনজেপি থেকে সেবক, এনএইচ১০ আর মংপুর রাস্তা হয়ে মোটামুটি ৬১ কিমি। কার্শিয়াং থেকে প্রায় ২৬, দার্জিলিং থেকে প্রায় ৩৪ কিমি (ওপেনস্ট্রিটম্যাপ, মানচিত্রে গ্রামের বিন্দু পর্যন্ত)
- বড় স্টেশন আর বিমানবন্দর
- নিউ জলপাইগুড়ি, বাগডোগরা
- উচ্চতা
- মানচিত্রের বিন্দুতে ৭০০ মিটারের নীচে, উপগ্রহের উচ্চতা-মাপে
- থাকা
- পরিবারের হোমস্টে। জেলাশাসকের দেওয়া রেজিস্ট্রেশন সার্টিফিকেট দেখতে চাইবেন
- সাথে রাখুন
- প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্কের সচিত্র পরিচয়পত্র (হোমস্টে কপি রাখবে)। বিদেশি অতিথির পাসপোর্ট
সিটংয়ের হোমস্টে: নিয়ম কী বলছে
সিটংয়ে যে হোমস্টেতেই উঠুন, তার নিয়ম বেঁধে দিয়েছে রাজ্যের নীতি। পশ্চিমবঙ্গ হোমস্টে পর্যটন নীতি ২০২২ বেরিয়েছিল কলকাতা গেজেটে, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২২। সেই নীতিতে হোমস্টে মানে মালিক বা তাঁর পরিবার নিজেরাই যে বাড়িতে থাকেন, আর অতিথিদের অন্তত একটা, বড়জোর ছ’টা ঘর ছেড়ে দেন। বিছানা সব মিলিয়ে বারোটার বেশি নয়। শৌচাগার থাকবে শুধু অতিথিদের জন্য। আবেদন করতে হয় জেলাশাসকের কাছে। একটা কমিটি বাড়ি দেখে যায়, পুলিশ মালিকের খোঁজখবর নেয়। রেজিস্ট্রেশনের মেয়াদ তিন বছর।
নীতির তিনটে কথা সরাসরি আপনার কাজে লাগবে। মালিককে হোটেলের মতো খাতা রাখতে হয়, আর যাঁরা থাকছেন তাঁদের বৈধ সচিত্র পরিচয়পত্রের কপি। তাই প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্কের পরিচয়পত্র সাথে নিন। বিদেশি অতিথির পাসপোর্টের তথ্য স্থানীয় থানায় পাঠাতে হয় ‘ফর্ম সি’-তে, হোটেলও ঠিক এই ফর্মই জমা দেয়। আর রেজিস্টার্ড হোমস্টের তালিকা থাকে জেলাশাসকের দফতরে। কাজেই অগ্রিম দেওয়ার আগে সার্টিফিকেটটা দেখতে চাইতেই পারেন, তাতে অন্যায় কিছু নেই। রেজিস্টার্ড হোমস্টের সেটা না দেখানোর কোনও কারণ নেই।
পাহাড়ি সন্ধের গল্প
পাহাড়ি গ্রাম চুপ হয়ে যায় সন্ধে না গড়াতেই। খাওয়াদাওয়া সেরে ঘুমোতে যাওয়ার আগের ঘণ্টাটায় ফোনের টাওয়ার খোঁজার চেয়ে একটা লম্বা গল্প শোনা ঢের ভালো। আমাদের সংগ্রহে এই পাহাড়েরই তিনটে গল্প আছে। কার্শিয়াংয়ের ডাউহিল তো একাধিক ভূতের গল্পে ফিরে ফিরে আসে। এখানে যেটা রাখলাম, সেটা ভুবন ঠাকুরের সিরিজের।
৫১:০৫শুনুন: ডাউহিলের আতঙ্ক, ভুবন ঠাকুর পর্ব ২ডাউহিলের আতঙ্ক, ভুবন ঠাকুর পর্ব ২
THRILLER LAND
কার্শিয়াং শহরের মাথায় ডাউহিলে এক কিশোর নিখোঁজ। গল্পটা একান্ন মিনিটের, বলার ঢংটাই আলো নিভিয়ে শোনার মতো।
২:১৯:৫৪শুনুন: দার্জিলিং জমজমাট, ফেলুদাদার্জিলিং জমজমাট, ফেলুদা
Mirchi Bangla
সত্যজিৎ রায় ফেলুদাকে পাঠিয়েছেন দার্জিলিংয়ে, এক শুটিং দলের সাথে। দু ঘণ্টা কুড়ি মিনিট, গোটা একটা সন্ধে।
১:২৯:১৪শুনুন: কালিম্পংয়ে সীতাহরণ, অর্জুনকালিম্পংয়ে সীতাহরণ, অর্জুন
Mirchi Bangla
সমরেশ মজুমদারের জলপাইগুড়ির তরুণ গোয়েন্দা, এবার তিস্তার ওপারে। উননব্বই মিনিট।
আর শিলিগুড়ি ছেড়ে চড়াই শুরু হওয়ার আগের পথটুকুতে শোনার মতো একটা গান রইল আমাদের লং ড্রাইভ মুড থেকে।
৩:২৩পথের ক্লান্তি ভুলে, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়
Saregama Bengali
‘মরুতীর্থ হিংলাজ’ ছবির গান। পথের ক্লান্তি ভুলে যাওয়ার কথা। সেবকে যেখানে প্রথম তিস্তা চোখে পড়ে, সেখানে চালিয়ে দিন।
ডিসেম্বরে গেলে যাবেন কমলার টানে। ফেরার সময় কাগজের ঠোঙায় কয়েকটা ভরে আনবেন, কলকাতার অনেক বাড়ি যেমন আনে। অক্টোবরে গেলে যান উপত্যকাটার জন্যই। তারপর ডিসেম্বরে আরেকবার গিয়ে দেখে আসুন, রংটা কেমন বদলায়।
তথ্যসূত্র (৮)
- West Bengal Homestay Tourism Policy 2022 (কলকাতা গেজেট, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২২), পর্যটন দফতর, পশ্চিমবঙ্গ সরকার। দেখা হয়েছে ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬।
- Sittong Forest, সংস্কৃতি মন্ত্রক, ভারত সরকার। দেখা হয়েছে ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬।
- Climatological Tables 1991-2020 (দার্জিলিং কেন্দ্র), ভারতীয় আবহাওয়া দফতর। দেখা হয়েছে ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬।
- Sittong, উইকিপিডিয়া। দেখা হয়েছে ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬।
- Mangpu, উইকিপিডিয়া। দেখা হয়েছে ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬।
- Cinchona cultivation in British India, উইকিপিডিয়া। দেখা হয়েছে ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬।
- Rambi Bazar, উইকিপিডিয়া। দেখা হয়েছে ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬।
- Darjeeling, উইকিপিডিয়া। দেখা হয়েছে ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬।
ছবি: সিটংয়ে গাছভর্তি কমলা। ফল পাকে নভেম্বর থেকে জানুয়ারি: Photo: Auli Raha, Wikimedia Commons, CC BY-SA 4.0
সদ্য এসেছেগল্পের চ্যানেলে নতুন কী এলসবে যা উঠেছে, বাজে চ্যানেলের নিজের ইউটিউবেই।গল্পগুলো দেখুনমুড কলকাতাকে ফলো করুন
এমন লেখা, নতুন গল্প আর গান এলেই খবর পাবেন।


