মূল অংশে যান
MoodKolkata
ঝকঝকে নীল আকাশের নীচে রোদে জ্বলজ্বল করছে সাদা কাশফুল
কাশফুল, শরতের সাদা ফুল। উমার ঘরে ফেরার ঋতু

শোনা

আগমনী গান: মেয়ে ঘরে ফেরার গান, মায়ের গলায়

আগমনী গান কাকে বলে, রামপ্রসাদ, কমলাকান্ত আর রবীন্দ্রনাথ এই গানে কী শুনেছিলেন, আর মহালয়া থেকে ষষ্ঠী পর্যন্ত কোন ছ’টা আগমনী এই পাতাতেই বাজিয়ে শুনবেন।

রাজীব সেনপ্রকাশ হালনাগাদ

এই লেখায় (৫)

শরতের নীল আকাশ। মাঠের ধারে কাশ। রেডিওতে মহালয়ার ভোর। আর তারই মধ্যে কোথাও একটা গান, যেখানে কোনও দেবীর কথা নেই, আছে এক মা আর তাঁর বিয়ে হয়ে যাওয়া মেয়ে।

আগমনীর মূল কথা এটাই। বাংলা উইকিপিডিয়া আগমনী গানের পাতায় কথাটা সোজাসুজিই লিখেছে: উমা বাপের বাড়ি আসেন দেবী হিসেবে নয়, কন্যা হিসেবে। গিরিরাজ হিমালয় আর মেনকার মেয়ে, শ্মশানবাসী শিবের ঘরনি, বছরে একবার কদিনের জন্য ঘরে ফেরেন। ঠিক কদিন, তা নিয়ে দুই উইকিপিডিয়া একমত নয়। বাংলা বলছে দিন চারেক, ইংরেজি পুজোর তিন দিন। মেয়ে অন্য শহরে থাকলে মা জানেন, সে এলে দিনগুলো গুনে ওঠার আগেই ফুরিয়ে যায়।

আগমনী গান কাকে বলে

আগমনী গান উমার ঘরে ফেরার গান, মায়ের দিক থেকে গাওয়া। গল্পটা সবার জানা, তবু গানগুলো শুনলে বোঝা যায় কবিরা কোন মুহূর্তটা ধরেছিলেন। শরতের এক রাতে মেনকা স্বপ্নে মেয়েকে দেখেন। ঘুম ভেঙে তিনি গিরিরাজকে তাড়া দেন, যাও, উমাকে নিয়ে এসো। ইংরেজি উইকিপিডিয়ার আগমনী-বিজয়ার পাতাতেও এই স্বপ্নের কথা আছে। তারপর মেয়ে আসে, কদিন থাকে, আর তার যাওয়ার দিন যে গান গাওয়া হয়, তার নাম বিজয়া। আগমনী আর বিজয়া আসলে একটাই গানের দুটো দিক: আসার আনন্দ, আর যাওয়ার কান্না।

রবীন্দ্রনাথ এই স্বপ্নটাকেই সব আগমনীর গোড়া বলেছিলেন। ‘লোকসাহিত্য’-র ‘গ্রাম্যসাহিত্য’ প্রবন্ধে তাঁর কথা, ‘এই স্বপ্ন হইতে কথা আরম্ভ। সমস্ত আগমনী গানের এই ভূমিকা।’ ওই প্রবন্ধে আরও একটা ছবি আছে, পড়লে কানে বাজে: আমাদের ঠাকুরদার আমল থেকে গিরিরাজ এই স্বপ্নের কথা শুনে আসছেন ললিত, বিভাস আর রামকেলিতে, মানে ভোরের রাগে। বইটার পুরোনো ছাপা ইন্টারনেট আর্কাইভে আছে।

মায়ের গান, দেবীর নয়

আগমনীর কথায় আসল মানুষ মেনকা। উমা প্রায় কিছু বলেন না, বলেন মা। আর সেই মা ভক্ত নন, একেবারে ঘরের মানুষ। তাঁর রাগ আছে, অভিমান আছে, জামাইয়ের ওপর ক্ষোভও আছে। রামপ্রসাদ সেনের একটা পদ শুরু হয় এভাবে:

‘গিরি, এবার আমার উমা এলে, আর উমা পাঠাব না।’ পদটা আছে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘শাক্ত পদাবলী’-তে, অমরেন্দ্রনাথ রায়ের সম্পাদনায়। বইটার স্ক্যান ইন্টারনেট আর্কাইভে আছে, আর সেখানে এই পদের নীচে রামপ্রসাদের নাম। একই পদে মা জানিয়ে রাখেন, জামাই নিতে এলে মায়ে-ঝিয়ে ঝগড়া করবেন, জামাই বলে মানবেন না। দুশো বছরের বেশি আগের এক গৃহস্থ বাড়ির রাগ, আজও চেনা।

রামপ্রসাদের বাড়ি ছিল গঙ্গার ধারের কুমারহট্টে, আজকের হালিশহরে। মারা যান আন্দাজ ১৭৭৫ সালে। বাংলা উইকিপিডিয়ার আগমনী গানের পাতা তাঁকেই আগমনীর প্রথম ও শ্রেষ্ঠ গীতিকার বলে। তাঁকে নিয়ে একটা কিংবদন্তিও আছে। এই গানের পাশে রাখলে সেটা অন্যরকম শোনায়। কালী নাকি তাঁর মেয়ে জগদীশ্বরীর রূপ ধরে এসে তাঁর বেড়া বেঁধে দিয়েছিলেন। যে কবি দেবীকে মেয়ে বানিয়ে গান লিখলেন, কিংবদন্তিতে দেবী তাঁর ঘরে মেয়ে হয়েই এলেন।

রামপ্রসাদের পরে সবচেয়ে বড় নাম কমলাকান্ত ভট্টাচার্য। আঠারো আর উনিশ শতকের সন্ধির কবি, ছিলেন বর্ধমানের মহারাজা তেজচন্দ্রের সভায়। ওই সংকলনেই তাঁর একটা পদ মায়ের স্বপ্ন দিয়ে শুরু, ‘কাল স্বপনে শঙ্করী-মুখ হেরি কি আনন্দ আমার’। মা দেখেছেন উমা কোলে বসে ‘মা’ বলে ডাকছে। ঘুম ভাঙতেই আর সহ্য হয় না। পদের শেষে কবি নিজেই গিরিরাজকে বলেন, আর দেরি কোরো না।

সম্পাদক সংকলনের ভূমিকা লিখেছিলেন ১৯৪২ সালে। সেখানে তাঁর দাবি, আগমনী আর বিজয়া বাঙালি ছাড়া কেউ লিখতে পারত না, কারণ বাঙালিই ‘মাকে মেয়ে সাজাইয়া’ ঘরে এনেছে। কথাটা একটু বড়াইয়ের মতো শোনায়, কিন্তু গানগুলো পাশাপাশি পড়লে অস্বীকার করাও কঠিন।

রবীন্দ্রনাথ যা শুনেছিলেন

সবচেয়ে গভীর কথাটা রবীন্দ্রনাথেরই। ‘লোকসাহিত্য’-র ‘ছেলেভুলানো ছড়া’ প্রবন্ধে তিনি লিখেছিলেন, আমাদের দেশের এক কঠিন অন্তর্বেদনা হল মেয়েকে শ্বশুরবাড়ি পাঠানো, কচি অবুঝ মেয়েকে পরের ঘরে তুলে দেওয়া। কয়েক লাইন পরে এক বাক্যে সব বলে দিয়েছিলেন:

‘আগমনী এবং বিজয়া বাংলার মাতৃহৃদয়ের গান।’ ‘গ্রাম্যসাহিত্য’-তে তিনি ছবিটা আরও বড় করেছেন: সপ্তমীর দিন গোটা বাংলার মেয়ে-বউয়েরা বাপের বাড়ি আসে, আর বিজয়ার দিন ‘সমস্ত বাংলা দেশের চোখে জল ভরিয়া আসে’। উমা তাহলে একজন নন। ঘরে ঘরে তিনি সেই মেয়ে, যে বছরে একবার আসে।

এখানেই আগমনীর জোর। আমরা যখন ঠাকুর দেখতে বেরোই, প্রতিমার চোখে দেবী দেখি। কিন্তু যে গান দিয়ে পুজো শুরু হয়, তার চোখ অন্য দিকে: একটা বারান্দা, আর সেখানে এক মা, রাস্তার দিকে তাকিয়ে। শ্বশুরবাড়ি থেকে মেয়ে পুজোয় আসতে পারবে কি না, বাংলার কত ঘরে পুজোর আসল প্রশ্ন আজও সেটাই।

রামপ্রসাদের পরে: কবিয়াল থেকে নজরুল

ধারাটা থামেনি। বাংলা উইকিপিডিয়ার তালিকায় পরের কবিদের মধ্যে আছেন কবিয়াল রাম বসু, দাশরথি রায় আর কাজী নজরুল ইসলাম। ওই সংকলনের আগমনী অংশেও রাম বসু আর দাশরথির পদ আছে। সেখানে গিরিশচন্দ্র ঘোষেরও একটা পদ আছে, আর তাতে মেনকা বলছেন, জামাই তো পেটের ছেলের মতো। জামাইয়ের বেলায় অন্তত, রামপ্রসাদের রাগী মায়ের উল্টো সুর।

ফিকিরচাঁদ নামে বাউল গান লিখতেন কাঙাল হরিনাথ। ওই সংকলনে তাঁর পদও আছে। ১৯০৩ সালে বেরিয়েছিল ফিকিরচাঁদের বাউল গানের সংকলন, আর বইটার নামেই আগমনী সংগীতের কথা। তাঁর এক বিজয়া পদের শেষ কথাটা মনে রাখার মতো: মায়ের আবাহনও নেই, বিসর্জনও নেই, তিনি থাকেন বুকের ভিতরে। বিদায়ের গান শেষ হয় না-যাওয়ায়।

কোন আগমনী শুনবেন

নীচের ছ’টা গান এই পাতাতেই বাজে। মহালয়ার ভোর থেকে ষষ্ঠীর সন্ধে পর্যন্ত রোজ একটা করে চালিয়ে দিন, ঢাক বাজার আগেই মনটা পুজোয় পৌঁছে যাবে। আমাদের পুজোর দিন ধরে ধরে গানের তালিকা এখান থেকেই শুরু, আর বাকিটা পুজোর মুডে।

৪:১৫

ও মা কেমন করে হরের ঘরে

Aalo | আলো 🪔

অন্বেষা গঙ্গোপাধ্যায়ের গলায়, ৪ মিনিট ১৫ সেকেন্ড। ‘আলো’ জানিয়েছে কথা গিরিশচন্দ্র ঘোষের, সুর প্রচলিত। নামটাই মেনকার প্রশ্ন: হরের ঘরে কেমন করে ছিলি মা? আগমনীর সবটা এক লাইনে।

পুজো মুডে আরও

৪:২১

আয় মা উমা

Aalo | আলো 🪔

রাহুল দত্তের গলায়, ৪ মিনিট ২১ সেকেন্ড। ‘আলো’-র তথ্য অনুযায়ী কথা ও সুর কাজী নজরুল ইসলামের। মেয়েকে ডাকার গান। মহালয়ার সকালে চালিয়ে দিন।

পুজো মুডে আরও

৩:১৩

গৌরী এলো

Times Music Bangla

‘রক্তবীজ’ ছবিতে গেয়েছেন দোহার আর তীর্থ ভট্টাচার্য, ৩ মিনিট ১৩ সেকেন্ড। টাইমস মিউজিক বাংলা লিখেছে গানটা প্রচলিত, সংগ্রহ শ্যামাপদ ভট্টাচার্য আর কালিকাপ্রসাদ ভট্টাচার্যের। ষষ্ঠীর দিন, মেয়ে এসে পৌঁছোনোর গান।

পুজো মুডে আরও

৭:০৩

আসছে জামাই দিগম্বর

SVF Music

পার্বতী বাউল, ৭ মিনিট ৩ সেকেন্ড। এসভিএফ মিউজিকের বিবরণে এটা পুরোনো বাউল গান, কবির নাম অজানা, শশাঙ্ক গোঁসাইয়ের আখড়ায় গাওয়া। এখানে কথা জামাইকে নিয়ে: শ্মশানে থাকা, ছাই-মাখা এই দিগম্বর জামাইকে মেনকা মানবেন তো? রামপ্রসাদের মেনকার রাগটাই, অন্য রাস্তা দিয়ে এল।

লোকগীতি মুডে আরও

৫:৪১

আগমনী আলো

Jayati Chakraborty

জয়তী চক্রবর্তী, ৫ মিনিট ৪১ সেকেন্ড। গানটা ‘মহিষাসুরমর্দিনী’-র ‘ওগো আমার আগমনী আলো’। কথা বাণীকুমারের, সুর পঙ্কজকুমার মল্লিকের, অনুষ্ঠানে প্রথম গেয়েছিলেন শিপ্রা বসু। জয়তীর চ্যানেল জানিয়েছে এই সংস্করণের সংগীতায়োজন প্রত্যুষ বন্দ্যোপাধ্যায়ের।

পুজো মুডে আরও

৫:১৩

শারদরূপিণী মা

Nilanjanaa De

নীলাঞ্জনা দে, ৫ মিনিট ১৩ সেকেন্ড, কথা ও সুর তাঁর বাবা দুলাল দে-র। তাঁর চ্যানেল গানটাকে বলেছে ‘বাংলা আগমনী গান’। এখানে দেবীকে জাগানোর ডাক। নতুন গান, পুরোনো আগমনীর মেয়ে থেকে সরে এসেছে দেবীর দিকে। ‘ও মা কেমন করে হরের ঘরে’-র পরে এটা চালান, তফাতটা সঙ্গে সঙ্গে কানে ধরা পড়বে।

পুজো মুডে আরও

আগমনীর মেনকা কোনও এক পাহাড়ের রানি নন। তিনি কলকাতার ফ্ল্যাটের সেই মা, যিনি বেঙ্গালুরু থেকে মেয়ের ফ্লাইট কখন নামবে, তিনবার জিজ্ঞেস করেন। ঢাকার সেই মা, মেলবোর্নের সেই মা। গান দুশো বছর পুরোনো, অপেক্ষাটা প্রতি বছর নতুন।

তথ্যসূত্র (৮)
সদ্য এসেছেগল্পের চ্যানেলে নতুন কী এলসবে যা উঠেছে, বাজে চ্যানেলের নিজের ইউটিউবেই।

মুড কলকাতাকে ফলো করুন

এমন লেখা, নতুন গল্প আর গান এলেই খবর পাবেন।

  1. শোনা

    মান্না দে-র বাংলা গান: শুরু করুন এই ১৪টা দিয়ে

  2. শোনা

    পুরোনো বাংলা গান: ২০টা আধুনিক গান, কে লিখেছেন, কে সুর দিয়েছেন

  3. শোনা

    ভূতের গল্প: বাংলার কোন জায়গায় কোন গল্প, অঞ্চল ধরে ধরে

থামানো

হোম স্ক্রিনে MoodKolkata যোগ করুন

  1. ব্রাউজারের বারে শেয়ার-এ চাপুন (উপরে তীর-দেওয়া চৌকো চিহ্ন)।
  2. নীচে নেমে “Add to Home Screen”-এ চাপুন।
  3. “Add”-এ চাপুন। হোম স্ক্রিন থেকে MoodKolkata অ্যাপের মতোই খুলবে।