
বেড়ানো
দার্জিলিং (Darjeeling) যাওয়ার সেরা সময়: মাস ধরে ধরে
দার্জিলিঙে সবচেয়ে পরিষ্কার সকাল আর প্রায় বৃষ্টিহীন দিন মেলে অক্টোবর থেকে ডিসেম্বরে, দ্বিতীয় পছন্দ মার্চ-এপ্রিল। প্রতিটা মাসের কথা এখানে, আবহাওয়া কেন্দ্রের নিজের তিরিশ বছরের হিসেব ধরে।
এই লেখায় (৭)
সত্যজিৎ রায়ের ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা’ ছবিতে কলকাতার এক পরিবার দার্জিলিঙে ছুটির শেষ দিনটা কাটায়, অথচ যে পাহাড়ের টানে আসা, তার দেখা মেলে না। ছবিটা মোটামুটি একশো মিনিটের, ঘটনাও চলে প্রায় ঘড়ি ধরে। মেঘ কাটে একেবারে শেষে। কুয়াশা সরে, চূড়া বেরিয়ে আসে। বাড়ির কর্তা তখন নিজের পরিকল্পনা নিয়ে এতই ব্যস্ত যে চোখ তুলে প্রায় দেখেনই না।
দার্জিলিঙে যাঁরা গেছেন, তাঁদের অনেকেই অন্তত একবার এভাবে অপেক্ষা করেছেন। ভোরে টাইগার হিলে, কিংবা ম্যালে বসে, হাতের চা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে। তাই ‘কখন যাব’ প্রশ্নটা আসলে এই: কোন সময়ে মেঘ সরার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি।
ট্রাভেল এজেন্টের ব্রোশিওরের চেয়ে এর ভালো উত্তর দেয় ভারতের আবহাওয়া দফতর। ২,১২৮ মিটার উঁচুতে তাদের দার্জিলিং কেন্দ্র তিরিশ বছরের গড় ছেপেছে। তার একটা কলামে গোনা আছে, মাসে ক’টা সকালে বহু দূর পর্যন্ত দেখা যায়।
আবহাওয়া কেন্দ্র কী গোনে
আবহাওয়া দফতরের ১৯৯১ থেকে ২০২০-র জলবায়ু সারণিতে প্রতিটা মাসের পাশে লেখা আছে দিনের গড় সর্বোচ্চ আর রাতের গড় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা। আছে বৃষ্টির মাপ, আর ক’দিন বৃষ্টি হয় তার হিসেব। বৃষ্টির দিন মানে যেদিন ২.৫ মিমি বা তার বেশি জল পড়েছে। আর আছে: সকাল সাড়ে আটটায় আর বিকেল সাড়ে পাঁচটায় কত দূর পর্যন্ত দেখা যায়।
পাহাড় দেখা যাবে কি না, তার আন্দাজ মেলে এই শেষ হিসেবটা থেকে। তবে দুটো এক জিনিস নয়। ৮,৫৯৮ মিটারের কাঞ্চনজঙ্ঘা শহর থেকে ৭৪.৪ কিলোমিটার উত্তরে। তবু কেন্দ্র থেকে ২০ কিলোমিটারের বেশি দেখা গেলে সে সকালে আশা আছে। ৪ কিলোমিটারও না দেখা গেলে সেদিন কোনও আশা নেই।
| মাস | দিন / রাত (ডিগ্রি) | বৃষ্টি | বৃষ্টির দিন | পরিষ্কার সকাল (সাড়ে আটটায় ২০ কিমির বেশি) |
|---|---|---|---|---|
| জানুয়ারি | ১১.১ / ১.৭ | ১০.৮ মিমি | ০.৯ | ১৫.৬ |
| ফেব্রুয়ারি | ১২.৪ / ৩.১ | ১১.৪ মিমি | ১.২ | ১১.০ |
| মার্চ | ১৫.৯ / ৬.০ | ২৬.৪ মিমি | ২.৬ | ১৩.৬ |
| এপ্রিল | ১৮.৬ / ৯.০ | ৮৯.০ মিমি | ৬.৭ | ১৩.২ |
| মে | ১৯.৩ / ১০.৮ | ১৬০.৩ মিমি | ১০.২ | ৬.৭ |
| জুন | ১৯.৮ / ১২.৮ | ৪১৯.১ মিমি | ১৭.৯ | ৪.৩ |
| জুলাই | ১৯.৫ / ১৩.৪ | ৬৪৮.৫ মিমি | ২৩.৪ | ২.৫ |
| আগস্ট | ১৯.৯ / ১৩.৫ | ৫২৯.৮ মিমি | ২২.০ | ৪.৩ |
| সেপ্টেম্বর | ১৯.৫ / ১২.৭ | ৩৮৫.২ মিমি | ১৬.১ | ৬.১ |
| অক্টোবর | ১৯.৪ / ৯.৯ | ৭৮.৮ মিমি | ৩.৯ | ১৬.৮ |
| নভেম্বর | ১৭.২ / ৬.২ | ১১.২ মিমি | ০.৬ | ১৭.২ |
| ডিসেম্বর | ১৩.৭ / ৩.৫ | ২.৮ মিমি | ০.৭ | ১৭.০ |
শেষ কলামটা ওপর থেকে নীচে পড়ুন, বছরটা দু’ভাগ হয়ে যায়। অক্টোবর থেকে জানুয়ারি, মাসে ১৫-১৭টা সকালে দূরের পাহাড় খোলে। জুন থেকে সেপ্টেম্বরে খোলে ২-৬টা সকালে। সমতলের মতো গ্রীষ্ম এখানে বলতে গেলে নেই। শহরের সবচেয়ে গরম মাস আগস্ট, তারও দিনের গড় ১৯.৯ ডিগ্রি। ওই একই সারণিতে কলকাতার আলিপুরে জানুয়ারির দুপুরের গড় ২৫.৫ ডিগ্রি। দার্জিলিঙের আগস্ট তাই কলকাতার শীতের দুপুরের চেয়েও ঠান্ডা।
অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর: আকাশ খোলার মাস
পাহাড় দেখার সেরা মাস এই তিনটে। বর্ষা দার্জিলিং ছাড়ে তাড়াহুড়ো করে। সেপ্টেম্বরেও বৃষ্টি ৩৮৫.২ মিমি। অক্টোবরে নেমে আসে ৭৮.৮-এ, নভেম্বরে ১১.২, ডিসেম্বরে ২.৮, আর শেষ দু’মাসে বৃষ্টির দিন একটাও পুরো হয় না। পরিষ্কার সকাল বাড়ে সমান তালে, অক্টোবরে ১৬.৮, নভেম্বরে ১৭.২। এই সময়ে বিকেলগুলোও খোলা থাকে। অক্টোবরে সাড়ে পাঁচটাতেও ১৬.১ দিন দূর পর্যন্ত দেখা যায়।
ভিড়ও তাই এই মাসগুলোতেই। উইকিপিডিয়ায় দার্জিলিঙের পাতায় ২০১৪ সালের এক গবেষণার উল্লেখ আছে। তার হিসেবে শহরের ভরা মরসুম দুটো: সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বর, আর এপ্রিল-মে। ওই পাতাতেই ২০২০ সালের আরেকটা গবেষণা গুনেছে ভিড় কী ফেলে যায়: দিনে প্রায় ৩০ টন কঠিন বর্জ্য, ভরা মরসুমে ৫০ টন পর্যন্ত।
বেছে নেওয়ার সুযোগ থাকলে আমরা বলব নভেম্বর, পারলে কালীপুজোর পরে। এ বছর কালীপুজো পড়েছে রবিবার, ৮ নভেম্বর। দিন আরামের, ১৭.২ ডিগ্রি। রাত ঠান্ডা, ৬.২। কাগজে-কলমে এটাই বছরের সবচেয়ে পরিষ্কার মাস। মিলিয়ে দেখুন: ওই একই সারণিতে কলকাতায় নভেম্বরের গড় সর্বোচ্চ ৩০.২ ডিগ্রি।
ডিসেম্বরও প্রায় ততটাই পরিষ্কার, ভালো সকাল ১৭টা। রাতে অবশ্য ঠান্ডা বেশি, ৩.৫ ডিগ্রি। পাহাড় দেখা চাই, আর রাতে খেতে বসে গায়ে ভারী জ্যাকেট চাপাতে আপত্তি নেই, এমন লোকের মাস ডিসেম্বর।
জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি: কনকনে, শুকনো, ভিড় কম
জানুয়ারি সবচেয়ে ঠান্ডা মাস, দিনে ১১.১ ডিগ্রি, রাতে ১.৭। কেন্দ্রের খাতায় পারদ শূন্যের নীচেও নেমেছে, সর্বনিম্ন মাইনাস ৭.২ ডিগ্রি। বৃষ্টি প্রায় নেই, গোটা মাসে ১০.৮ মিমি। পরিষ্কার সকালও থাকে ১৫.৬টা। ফেব্রুয়ারিতে ঠান্ডা একটু কমে, কিন্তু বিকেলগুলো ঝাপসা হয়ে যায়। সারা মাসে মাত্র ৪.২টা বিকেলে ২০ কিলোমিটারের বেশি দেখা যায়।
মার্চ থেকে মে: দ্বিতীয় সুযোগ, আর চায়ের মরসুম
বসন্তে আসে দ্বিতীয় ভরা মরসুম, সাথে যাওয়ার আলাদা একটা কারণ। শীত কাটলে চা-বাগানে প্রথম পাতা তোলা শুরু হয়। দার্জিলিং চায়ের এই ‘ফার্স্ট ফ্লাশ’ ওঠে মার্চ থেকে মে পর্যন্ত, ‘সেকেন্ড ফ্লাশ’ মে-জুনে। সকালগুলো মোটামুটি পরিষ্কার থাকে, মার্চে ১৩.৬, এপ্রিলে ১৩.২। কিন্তু মে-র মধ্যে বর্ষার আগের বৃষ্টি নেমে যায়: দশ দিনের মতো বৃষ্টিতে ১৬০.৩ মিমি, পরিষ্কার সকাল কমে ৬.৭।
জুন থেকে সেপ্টেম্বর: বর্ষা
দার্জিলিঙের সারা বছরের বৃষ্টির ৮০ শতাংশের বেশি ঝরে এই চার মাসে। দফতরের হিসেবে বছরে জল পড়ে ২,৩৭৩.৩ মিমি, তার ১,৯৮২.৬ মিমিই তখন। সবচেয়ে বেশি জুলাইয়ে, ২৩.৪ দিনে ৬৪৮.৫ মিমি। দূরের পাহাড় সে মাসে খোলে মাত্র ২.৫টা সকালে।
পাহাড় তখন সবুজ, চা-গাছে পাতাও আসে (‘মনসুন ফ্লাশ’)। তবে এটাই ধসের মরসুম। উইকিপিডিয়ার দার্জিলিঙের পাতায় আছে, এখানে বেশির ভাগ ধস নামে ভারী বৃষ্টি, ভূমিকম্প বা জলের তোড়ে দ্রুত ক্ষয়ে। ১৯৬৮ সালের এক ঝড়বৃষ্টিতে দার্জিলিং-শিলিগুড়ির ৫৬ কিলোমিটার রাস্তা ৯২ জায়গায় কেটে গিয়েছিল।
পাহাড় দেখতে বর্ষায় আমরা কাউকে পাঠাব না। পাঠাব মেঘ দেখার লোককে। উপত্যকা বেয়ে মেঘ উঠে আসছে, তিনি বসে দেখছেন, ঘড়ি ধরে কোথাও পৌঁছোনোর তাড়া নেই।
কলকাতা থেকে যাওয়া
চেনা পথ শিয়ালদহ থেকে রাতের দার্জিলিং মেলে নিউ জলপাইগুড়ি। সেখান থেকে গাড়িতে, নয়তো দার্জিলিং হিমালয়ান রেলওয়ের টয় ট্রেনে। ন্যারো গেজের এই লাইনের পথ ৮৮ কিলোমিটার। শুরু নিউ জলপাইগুড়িতে, মোটামুটি ১০০ মিটার উঁচু থেকে। শেষ দার্জিলিঙে, প্রায় ২,২০০ মিটারে। চালু হয়েছিল ১৮৮১ সালে। ‘মাউন্টেন রেলওয়েজ অফ ইন্ডিয়া’র অংশ হয়ে লাইনটা আছে ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায়। উইকিপিডিয়া লিখছে, এর ঘুম স্টেশনই ভারতের সবচেয়ে উঁচু রেলস্টেশন।
সাথে থাকুক একটা গল্প
ফেলুদার শুরু দার্জিলিঙেই। তাঁর প্রথম কেস ‘ফেলুদার গোয়েন্দাগিরি’ ‘সন্দেশ’-এ বেরোতে শুরু করে ১৯৬৫-র ডিসেম্বরে, গল্পও ওই শহরের। একুশ বছর পরে সত্যজিৎ তাঁকে আবার পাঠান, এবার জটায়ু আর একটা শুটিং দলের সাথে, ‘দার্জিলিং জমজমাট’-এ। দুটোই আছে আমাদের ফেলুদার পাতায়। ট্রেনে ফোন ঘাঁটার চেয়ে এ সঙ্গী ঢের ভালো।
৫৯:২৩শুনুন: ফেলুদার গোয়েন্দাগিরিফেলুদার গোয়েন্দাগিরি
Mirchi Bangla
ফেলুদা আর তোপসে ছুটিতে দার্জিলিঙে। পুরোনো জিনিস জমান এক বৃদ্ধ, তাঁর কাছে এসেছে হুমকি-চিঠি। এখান থেকেই সব শুরু। সানডে সাসপেন্স, মির্চি বাংলা, ৫৯ মিনিট।
২:১৯:৫৪শুনুন: দার্জিলিং জমজমাটদার্জিলিং জমজমাট
Mirchi Bangla
দার্জিলিঙে জটায়ুর উপন্যাসের শুটিং চলছে, তার মধ্যেই খুন। ১৯৮৬-র শারদীয় ‘দেশ’-এর জন্য লেখা। সানডে সাসপেন্স, মির্চি বাংলা, ২ ঘণ্টা ২০ মিনিট।
৫১:০৫শুনুন: ডাউহিলের আতঙ্কডাউহিলের আতঙ্ক
THRILLER LAND
দার্জিলিং শহর নয়, ওঠার পথে কার্শিয়াং। ডাউহিলে এক কিশোর নিখোঁজ, আর এই গল্পে আবার ফিরেছেন ভুবন ঠাকুর। কর্ণ শীল, থ্রিলার ল্যান্ডে, ৫১ মিনিট।
৪৭:১৯শুনুন: দার্জিলিঙের ভৌতিক ঘটনাদার্জিলিঙের ভৌতিক ঘটনা
221B Harrison Road
নামে দার্জিলিং আছে, এমন এক ভূতের গল্প। ২২১বি হ্যারিসন রোড চ্যানেলে, ৪৭ মিনিট। হোটেলের ঘরে সন্ধে নামার পরের জন্য তুলে রাখুন।
শহরে আরেকটা জায়গা খুঁজে নিন। ভগিনী নিবেদিতা মারা যান দার্জিলিঙে, রায় ভিলায়, ১৯১১ সালের ১৩ অক্টোবর। তাঁর স্মৃতিসৌধ রেলস্টেশনের নীচে, শহরের ভিক্টোরিয়া ফলসে যাওয়ার পথে। ফলকে লেখা, ‘Here lies Sister Nivedita who gave her all to India’। তিনি চলে গিয়েছিলেন অক্টোবরে, যে মাসে পাহাড়ের পরিষ্কার মরসুম শুরু হয়।
সত্যজিৎ তাঁর ছবির পরিবারটিকে কাঞ্চনজঙ্ঘার জন্য একশো মিনিট বসিয়ে রেখেছিলেন। নভেম্বরের হিসেব বলছে, আপনার অপেক্ষা তার চেয়ে কম হওয়ারই কথা।
তথ্যসূত্র (৯)
- Climatological Tables 1991-2020: Darjeeling, India Meteorological Department। দেখা হয়েছে ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬।
- Darjeeling, Wikipedia। দেখা হয়েছে ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬।
- Mountain Railways of India, UNESCO World Heritage Centre। দেখা হয়েছে ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬।
- Darjeeling Himalayan Railway, Wikipedia। দেখা হয়েছে ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬।
- Tiger Hill, Darjeeling, Wikipedia। দেখা হয়েছে ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬।
- Darjeeling tea, Wikipedia। দেখা হয়েছে ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬।
- Kanchenjungha, Wikipedia। দেখা হয়েছে ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬।
- Feludar Goendagiri, Wikipedia। দেখা হয়েছে ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬।
- Sister Nivedita, Wikipedia। দেখা হয়েছে ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬।
মুড কলকাতাকে ফলো করুন
এমন লেখা, নতুন গল্প আর গান এলেই খবর পাবেন।


