
বই
ঘনাদা: কে তিনি, আর তাঁর কোন গল্প আগে শুনবেন
১৯৪৫-এর পুজো থেকে কলকাতার এক মেসবাড়িতে বসে গুল মেরে চলেছেন প্রেমেন্দ্র মিত্রের ঘনাদা। তিনি কে, তাঁর গুল কেন টেকে, আর তিনটে অডিও গল্প আমরা কোন ক্রমে শুনতে বলি।
এই লেখায় (৫)
ঘনাদা এসেছিলেন যেভাবে একসময় বাঙালির পড়ার প্রায় সবকিছু আসত: মহালয়ার আগে কেনা মোটা পুজোসংখ্যার পাতায়। সেই বই নিয়ে বাড়ির ছোটদের মধ্যে কাড়াকাড়ি পড়ে যেত। ১৯৪৫ সালে দেব সাহিত্য কুটীরের পুজোসংখ্যা ‘আলপনা’-য় ছাপা হল ‘মশা’। গল্পে কলকাতার এক মেসবাড়ির বাসিন্দা ধারের সিগারেট টানতে টানতে বুঝিয়ে দিলেন, একটা মশার হাত থেকে গোটা পৃথিবীকে তিনি কীভাবে বাঁচিয়েছিলেন। বাংলা উইকিপিডিয়ায় ঘনাদার পাতা বলছে, এরপর প্রেমেন্দ্র মিত্র বছর বছর সেই প্রকাশকের পুজোবার্ষিকীতে একটা করে ঘনাদার গল্প লিখে গেছেন। ইংরেজি উইকিপিডিয়ার গল্পের তালিকায় অবশ্য কয়েকটা ফাঁকা বছরও আছে। একাশি বছর পরে আরেকবার তাঁর গুল শুনতে চাইলে, নবমীর রাতের চেয়ে ভালো রাত কমই আছে।
ঘনাদা কে?
ঘনাদার আসল নাম ঘনশ্যাম দাস। ছোট করে ঘনা, আর বয়সে বড় বলে ‘দা’। তাঁর সম্পর্কে একমাত্র ওই ‘দা’-টুকু নিয়েই কেউ প্রশ্ন তোলে না। থাকেন বাহাত্তর নম্বর বনমালি নস্কর লেনের মেসবাড়িতে, তিনতলার চিলেকোঠার ঘরে। একলা পুরুষমানুষের এমন মেস একসময় কলকাতার পাড়ায় পাড়ায় ছিল। প্রথম গল্পেই প্রেমেন্দ্র মিত্র তাঁর ছবি এঁকে দিয়েছেন: অবিবাহিত, কালো, লম্বা, এত রোগা যে কঙ্কাল মনে হয়, বয়স পঁয়ত্রিশ থেকে পঞ্চান্নর মধ্যে যা খুশি। তাঁকে কেউ কোনও কাজ করতে দেখেনি। আরামকেদারায় বসে থাকেন, খাওয়াদাওয়ায় তাঁর গভীর ভক্তি। সিগারেট ধার করেন, ফেরত দেন না কোনওদিন।
শ্রোতা মেসের চার যুবক: শিবু, শিশির, গৌর আর সুধীর। গল্পগুলো সুধীরেরই বলা। শেষ নামটার জন্য পাঠককে অনেক দিন অপেক্ষা করতে হয়েছিল। প্রথম আঠাশটা গল্পে কথকের কোনও নামই নেই। ‘ধুলো’ গল্পে এসে ঘনাদা প্রথম তাকে সুধীর বলে ডাকেন। একেবারে প্রথম গল্পে আবার এক বিপিনও আছে, তারপর সে মেস থেকে চিরকালের মতো উধাও। চারজনে সারাক্ষণ ফন্দি আঁটে। কখনও ঘনাদাকে কথার প্যাঁচে ফেলতে, কখনও খোশামোদ করে একটা গল্প বের করতে, কখনও স্রেফ একটা তর্কে জিততে। মাঝে মাঝে ঘনাদা কোণঠাসা হন। হারেন না কখনও।
প্রেমেন্দ্র মিত্র ভেবেচিন্তেই এমন নায়ক গড়েছিলেন। বাংলা উইকিপিডিয়ায় ১৯৮৩ সালের একটা সাক্ষাৎকার উদ্ধৃত আছে। সেখানে তিনি বলেছিলেন, বিদেশি কল্পবিজ্ঞানের নায়ক একাধারে পণ্ডিত আর পালোয়ান। তাই তিনি বেছে নিয়েছিলেন মেসের ভাত খাওয়া এক সাধারণ বাঙালিকে। এ নায়কের জোর গায়ে নয়, মুখে। ইংরেজি উইকিপিডিয়া আরও জানাচ্ছে, ঘনাদার আদল নাকি বিমল ঘোষের। অল্প বয়সে ভবানীপুরের গোবিন্দ ঘোষাল লেনের এক বোর্ডিং হাউসে প্রেমেন্দ্র মিত্র আর তিনি একসঙ্গে থাকতেন। ঘনাদার পাঠক যে মেসবাড়িটা চোখ বুজলেই দেখতে পান, তার শুরু তাহলে একটা সত্যিকারের মেস থেকেই।
ঘনাদার গুল টেকে কেন?
ঘনাদার গুল টেকে, কারণ তার চারপাশের সবটাই সত্যি। ঘনাদা কখনও ‘কোনও এক জায়গায়’ ছিলেন বলেন না। ‘মশা’-য় তিনি ১৯৩৯-এর গরমে অ্যাম্বার জোগাড়ের কাজ নিয়ে গেছেন শাখালিনে, উত্তর প্রশান্ত মহাসাগরের সেই দ্বীপে। সেখানে হঠাৎই গিয়ে পড়েন এক গবেষণাগারে। ভেতরে এক বিজ্ঞানী মশাকে অস্ত্র বানাচ্ছেন। দ্বীপটা সত্যি, তারিখটাও নিখুঁত: প্রশান্ত মহাসাগরে যুদ্ধ পৌঁছোনোর দু’বছরের কিছু বেশি আগে। বানানো শুধু ঘনাদার ভূমিকাটুকু। গোটা সিরিজের কৌশল এটাই। পাঠক তথ্য মিলিয়ে দেখেন, সব ঠিকঠাক পান। তর্ক করার মতো বাকি থাকে শুধু মাঝখানের মানুষটা।
ইতিহাস নিয়েও একই খেলা। কয়েকটা গল্প তাঁর পূর্বপুরুষদের নিয়ে। তাঁদেরই একজন বচনরাম দাস ছিলেন মোগল আমলের আগ্রায়। শিবাজী যে আগ্রা থেকে পালিয়েছিলেন, সে কথা আমরা অনেকেই স্কুলের ইতিহাস বইয়ে পড়েছি। ১৬৬৬ সালের ১৭ অগস্ট তিনি একটা ঝুড়িতে লুকিয়ে বেরিয়ে যান, আরেকটায় ছেলে শম্ভাজী। ‘আগ্রা যখন টলমল’ প্রশ্ন তোলে, ব্যবস্থাটা আসলে করেছিল কে। পদবিটা আন্দাজ করতে পারছেন নিশ্চয়ই।
কোথা থেকে শুরু: ঘনাদার তিনটে অডিও গল্প
আমাদের সংগ্রহে ঘনাদার রেকর্ডিং তিনটে, তিনটেই মির্চি বাংলার। এই ক্রমে শুনুন: প্রথম গল্প, তারপর ইতিহাস, শেষে উপন্যাস।
৩২:৫১শুনুন: মশামশা
Mirchi Bangla
১৯৪৫-এর প্রথম ঘনাদা। ধারের একটা সিগারেট ধরিয়েই শুরু: শাখালিন, অ্যাম্বার আর মশায় ভরা এক গবেষণাগার। সানডে সাসপেন্সে এসেছিল জুলাই ২০২৪-এ, ৩৩ মিনিটের। ঘনাদার কাছে পৌঁছোনোর সবচেয়ে ছোট রাস্তা।
১:০২:৩৭শুনুন: আগ্রা যখন টলমলআগ্রা যখন টলমল
Mirchi Bangla
১৯৬৬ সালের গল্প: আগ্রা থেকে শিবাজীর পালানো, আর সেই ফন্দির কোথাও একজন দাস। পাঠে অর্পণ মল্লিক। ফ্রাইডে ক্লাসিকসে প্রথম শোনা গিয়েছিল ১৮ জুলাই ২০২৫, চলে ৬৩ মিনিট।
২:১০:৪৬শুনুন: মঙ্গলগ্রহে ঘনাদামঙ্গলগ্রহে ঘনাদা
Mirchi Bangla
ঘনাদাকে নিয়ে প্রেমেন্দ্র মিত্র উপন্যাস লিখেছিলেন চারটে, এটা তার একটা। উইকিপিডিয়া এর সাল দিয়েছে ১৯৭২। শুরু এক ডাক্তারি পরীক্ষায়, এমন নাড়ির গতি নিয়ে যা কোনও বইয়ে লেখা নেই। থামে একেবারে মঙ্গলগ্রহে গিয়ে। সানডে সাসপেন্সে প্রথম সম্প্রচার ৩ নভেম্বর ২০২৪, চলে দু’ঘণ্টা এগারো মিনিট। লম্বা একটা সন্ধের জন্য তুলে রাখুন।
‘মশা’ আগে। কারণ পরের গল্পগুলো যা নিয়ে খেলে, তার সবকিছুর শুরু ওখানে: মেস, চার শ্রোতা, ধারের সিগারেট আর নির্বিকার মুখ। এই নবমীতে হাতে আধঘণ্টা থাকলে ওটাই শুনুন।
ঘনাদার পরে: প্রেমেন্দ্র মিত্রের আরও গল্প
প্রেমেন্দ্র মিত্রের জন্ম ১৯০৪ সালে বারাণসীতে, মৃত্যু ১৯৮৮-তে। বিশের দশকের কল্লোল গোষ্ঠীর লেখক তিনি। কবি, আবার ছবির পরিচালকও। গোয়েন্দা লিখেছেন, ভূত-শিকারি লিখেছেন, আর লিখেছেন ‘তেলেনাপোতা আবিষ্কার’, নীচের তালিকার শেষ গল্পটা। আমাদের প্রেমেন্দ্র মিত্রের পাতায় রেকর্ডিং ১৮টা। ঘনাদা শেষ হলে সেখান থেকে নীচের গল্পগুলো ধরুন।
১:৫৭:৪৬শুনুন: পরাশর এবার জহুরীপরাশর এবার জহুরী
Mirchi Bangla
প্রেমেন্দ্র মিত্রের গোয়েন্দা পরাশর বর্মা মনে মনে আসলে কবি হতে চান। শেষ দিকের দুটো ঘনাদার গল্পেও তাঁর দেখা মেলে। সানডে সাসপেন্সে, প্রায় দু’ঘণ্টার গল্প।
২৭:৪৩শুনুন: ভূত শিকারি মেজকর্তাভূত শিকারি মেজকর্তা
Mirchi Bangla
ঘনাদা যেভাবে শ্রোতা শিকার করেন, মেজকর্তা সেভাবে ভূত। হাসির গল্প, ফ্রাইডে ক্লাসিকসে ২৮ মিনিটের।
১:৪১:২৪শুনুন: মামাবাবু: কুহকের দেশেমামাবাবু: কুহকের দেশে
THRILLER LAND
মামাবাবু একসময় বর্মায় চাকরি করতেন। এবার তিনি বেরিয়েছেন এক বেনামি মৌমাছির খোঁজে। থ্রিলারল্যান্ডের দু’পর্বের গল্প, এটা প্রথম পর্ব।
৪১:১৪শুনুন: তেলেনাপোতা আবিষ্কারতেলেনাপোতা আবিষ্কার
Mirchi Bangla
এখানে কোনও গুল নেই। ম্যালেরিয়ায় ধুঁকতে থাকা এক গ্রামে শহরের এক যুবক, যামিনী নামে এক মেয়ে আর অন্য কারও দেওয়া একটা কথা। ফ্রাইডে ক্লাসিকসে, ৪১ মিনিটের। সবার শেষে শুনুন, চুপচাপ।
অন্য পাড়ার একই রকম হাসি চাইলে আছেন নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের টেনিদা। আর পুজোর রাতে যদি বড়াই ছেড়ে ভয়ের কথক চান, আমাদের তারানাথ তান্ত্রিকের গল্পের তালিকা ঠিক পাশের গলিতে।
ঘনাদা পড়তে চাইলে
গল্পগুলো একসঙ্গে পাবেন আনন্দ পাবলিশার্সের ‘ঘনাদা সমগ্র’-র খণ্ডগুলোয়। উইকিপিডিয়ায় আগের আলাদা বইগুলোর তালিকাও আছে, ১৯৫৬-র ‘ঘনাদার গল্প’ থেকে শুরু। ইংরেজিতে লীলা মজুমদারের অনুবাদ ‘দ্য অ্যাডভেঞ্চার্স অফ ঘনাদা’ বের করেছিল ন্যাশনাল বুক ট্রাস্ট, ১৯৮২ সালে। পেঙ্গুইন ইন্ডিয়া ২০০৪-এ ছেপেছে ‘মসকিটো অ্যান্ড আদার স্টোরিজ’। বেতারেও ঘনাদা এসেছেন। বাংলা উইকিপিডিয়া দুটো বেতার নাটকের কথা লিখেছে, ‘মশা’ আর ‘নুড়ি’। দুটোতেই ঘনাদার গলা দিয়েছিলেন অভিনেতা শেখর চট্টোপাধ্যায়।
ঘনাদাকে পড়ুন বা শুনুন প্রথম পাঠকদের মতো করেই: রাত করে, ঠাকুর দেখে ফিরে। ঘরে অন্তত একজন অবিশ্বাসী থাকুন। তিনি হলফ করে বলবেন, সবটাই বানানো। ঘনাদা কিছু মনে করবেন না। এ কথা তিনি আগেও শুনেছেন। সেটা নিয়েও তাঁর একটা গল্প আছে।
তথ্যসূত্র (৪)
- ঘনাদা (Ghanada), উইকিপিডিয়া (ইংরেজি)। দেখা হয়েছে ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬।
- ঘনাদা, বাংলা উইকিপিডিয়া। দেখা হয়েছে ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬।
- প্রেমেন্দ্র মিত্র (Premendra Mitra), উইকিপিডিয়া (ইংরেজি)। দেখা হয়েছে ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬।
- শিবাজী (Shivaji), উইকিপিডিয়া (ইংরেজি)। দেখা হয়েছে ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬।
মুড কলকাতাকে ফলো করুন
এমন লেখা, নতুন গল্প আর গান এলেই খবর পাবেন।


