
বই
নামের উচ্চারণ, জাতের প্রশ্ন: জেএনইউ-তে স্পিভাক
নামের তর্কে ডু বয়েস নিজেই স্পিভাকের পক্ষে, কিন্তু জেএনইউ-র হলঘরে দলিত ছাত্র অংশুল কুমারের যে প্রশ্ন সেদিন শোনা হলো না, তার শিকড় বিদ্যাসাগরের কলকাতায়।
এই লেখায় (৬)
নামে কী আসে যায়? প্রশ্নটা জুলিয়েটের। শেক্সপিয়রের নাটকে ক্যাপুলেটদের বাগানের দৃশ্যে সে বলে, গোলাপকে অন্য নামে ডাকলেও তার গন্ধ একই রকম মিষ্টি থাকবে। চারশো বছরেরও বেশি পরে, মঙ্গলবার, ২১ মে ২০২৪ সকালে, দিল্লির জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের এক হলঘরে কথাটা আর খাটল না। একটা নামের দুটো উচ্চারণের মাঝে থমকে গেল একটা প্রশ্ন। সেই ফাঁকে ঢুকে পড়ল শ্রেণি, জাত, বয়স, লিঙ্গ।
আমাদের পাঠ সোজা। উচ্চারণের তর্কে গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক ঠিক ছিলেন, কারণ ডু বয়েস নিজেই সেটা লিখে দিয়ে গেছেন। ভুলটা হয়েছিল অন্যখানে। দলিত ছাত্র অংশুল কুমারের প্রশ্নটা সেদিন আর শোনা হলো না। শুধরে দেওয়া সহজ, শোনা কঠিন। আর কুমারের সেই প্রশ্নের শিকড় দিল্লিতে নয়, উনিশ শতকের কলকাতায়, বিদ্যাসাগরের আমলে।
সেদিন সকালে, এসএএ অডিটোরিয়ামে
ঘটনাটা দু’বছরেরও বেশি আগের, মে ২০২৪-এর। ২০২৬-এ জেএনইউ-তে স্পিভাকের নতুন কোনও বক্তৃতা বা বিতর্কের খবর নেই।
বক্তার পরিচয় বাঙালি পাঠককে দিতে হয় না, তবু দু’লাইন থাক। জন্ম কলকাতায়, ২৪ ফেব্রুয়ারি ১৯৪২। ডায়োসেশন স্কুল আর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় পেরিয়ে কর্নেল থেকে পিএইচডি (১৯৬৭), ২০০৭ থেকে কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘ইউনিভার্সিটি প্রফেসর’। তাঁর সবচেয়ে চেনা প্রবন্ধ ‘ক্যান দ্য সাবঅল্টার্ন স্পিক?’ (১৯৮৮)। মহাশ্বেতা দেবীর লেখা ইংরেজিতে অনুবাদ করেছেন, ২০২৫ সালে পেয়েছেন হোলবার্গ পুরস্কার।
মে মাসের দিল্লি, সকাল ১০টা। বক্তৃতার বিষয় ডব্লিউ ই বি ডু বয়েস আর তাঁর গণতন্ত্রের ভাবনা। আয়োজক ‘জেএনইউ অ্যাকাডেমিক’, এক্স-এ চলা একটা আলোচনার মঞ্চ। শ্রোতাদের মধ্যে ছিলেন বৃন্দা বসু, পরে তিনি লিখেছেন গরম, উপচে-পড়া এক অডিটোরিয়ামের কথা। অংশুল কুমারের হিসেবে শ্রোতা ছিলেন হাজারখানেক। মঞ্চে যিনি, তাঁর বয়স তখন ৮২।
বৃন্দা বসুর মনে আছে, শুরুর মিনিট দশেক গিয়েছিল ডু বয়েসের পুরো নাম আর বংশপরিচয়ে। প্রশ্নোত্তরের আগেই স্পিভাক একাধিকবার বুঝিয়েছিলেন, নামটা ‘দ্যু বোয়া’ নয়, ‘ডু বয়েস’, আর এই উচ্চারণের পেছনে রাজনীতি আছে। ডু বয়েসের বেড়ে ওঠার পাশে রেখেছিলেন নিজের কলকাতার স্কুলবেলা, ধার করে কর্নেলে পড়ার খরচ আর যাওয়ার ভাড়া জোগানোর গল্প। প্রশ্ন চেয়েছিলেন ছাত্রছাত্রীদের কাছ থেকে, বিশেষ করে ছাত্রীদের।
প্রথম প্রশ্ন এল আজিম প্রেমজি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষকের কাছ থেকে। একটি বিবরণে আছে, তিনিও নামটা ভুল বলেছিলেন, তাঁকেও শুধরে দেওয়া হয়। তার পর প্রশ্ন করার পালা এল অংশুল কুমারের।
যে প্রশ্ন শোনা হলো না
নীচের সংলাপ বিবরণ, হুবহু উদ্ধৃতি নয়। কুমারের বয়স তখন ২৮, জেএনইউ-তে সমাজতত্ত্বে এমএ পড়ছেন। স্পিভাক জানতে চাইলেন, তিনি কে, কী করেন। কুমার নিজের পরিচয় দিলেন ‘সেন্টার ফর ব্রাহ্মিন স্টাডিজ’-এর প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক বলে। তার পর প্রশ্ন শুরু করলেন, আর ডু বয়েসের নামটা বললেন ফরাসি ঢঙে, ‘দ্যু বোয়া’।
স্পিভাক থামিয়ে দিলেন। একবার নয়, বারবার। কুমারের দাবি, তখন শ্রোতারা হাসছিলেন। এর মধ্যেই কুমার জানতে চাইলেন, এই তুচ্ছ ব্যাপারটা মিটলে কি প্রশ্নে যেতে পারেন? উত্তরে স্পিভাক মনে করিয়ে দিলেন, তিনি ৮২ বছরের এক মহিলা, প্রকাশ্য সভায়, ছাত্রটির নিজের প্রতিষ্ঠানে, আর কুমার তাঁর সাথে অভদ্রতা করছেন। এ-ও জানিয়ে দিলেন, তিনি ব্রাহ্মণ নন। সঞ্চালক কথা থামিয়ে পরের প্রশ্নে চলে গেলেন। প্রতিবাদে কুমার হল ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন।
হল থেকে বেরিয়ে ঘটনার ক্লিপ এক্স-এ তুলে দিলেন কুমার। সাথে স্পিভাকের উদ্দেশে দুটি কুরুচিকর গালি, তার অন্তত একটি স্পষ্টতই নারীবিদ্বেষী, আর একটা প্রশ্ন: ‘ক্যান দ্য সাবঅল্টার্ন স্পিক?’ স্পিভাকের সবচেয়ে চেনা প্রবন্ধের নামটাই ফিরে এল তাঁর দিকে, এবার ঢিল হয়ে। ক্লিপ ছড়িয়ে পড়ল। ২২ মে থেকে ৭ জুনের মধ্যে দেশ-বিদেশের এক ডজনেরও বেশি সংবাদমাধ্যম সেটা নিয়ে লিখল।
এখানে এসে থামতে হয়। দুজনের কাউকেই সহজে দোষী বানানো যায় না, আর সেটাই অস্বস্তির। একদিকে ৮২ বছরের এক মহিলা। গরম, ভিড়ে ঠাসা হলঘরে সকাল থেকে তিনি নামটা বোঝাচ্ছেন, আর তার পরেই এক্স-এ তাঁর নামে ছড়াবে দুটো গালি। অন্যদিকে ২৮ বছরের এক ছাত্র। তাঁর কথায়, উচ্চারণটা তিনি শিখেছিলেন মুম্বইয়ের সেন্ট জেভিয়ার্সে, এক ফরাসিভাষী শিক্ষকের কাছে। ভরা হলঘরে, তাঁর হিসেবে হাজারখানেক মানুষের সামনে, তাঁকে থামানো হলো বারবার। পরে এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, “আমি চামার। আমার গোটা জাত, আমার অস্তিত্বটাই একটা গালি। তা হলে আমার কাছে ভাষার শুদ্ধতা আশা করা হয় কেন?” এই তিনটে বাক্য পড়ার পর উচ্চারণের তর্কে ফিরতে ইচ্ছে করে না। আবার গালি দুটোর কথা মনে রাখলে তাঁর পক্ষে পুরোপুরি দাঁড়ানোও যায় না। দুজনেই সেদিন আহত, দুজনেই আঘাত দিয়েছেন।
এমন দৃশ্যে একলব্যকে মনে পড়বেই। মহাভারতের আদিপর্বে নিষাদরাজ হিরণ্যধনুর ছেলে একলব্য ধনুর্বিদ্যা শিখতে এসেছিলেন দ্রোণের কাছে। দ্রোণ তাঁকে শিষ্য করেননি, আর কারণটা মহাভারত লুকোয়নি। ছেলেটি নিষাদ, একদিন উঁচু বংশের শিষ্যদের ছাপিয়ে যেতে পারেন। একলব্য মাটির দ্রোণ গড়ে তার সামনে অভ্যাস করলেন। অর্জুন নালিশ করলে দ্রোণ গুরুদক্ষিণা চাইলেন তাঁর ডান হাতের বুড়ো আঙুল, আর একলব্য সেটা কেটে দিলেন। দ্রোণের সেই কথাকে মহাভারত নিজেই নিষ্ঠুর বলেছে। আজকের ভারতে একলব্য দলিত আর আদিবাসী অধিকারের প্রতীক।
উপমাটা লোভনীয়, তবে পুরো খাটে না। দ্রোণ শিষ্য নিতেই রাজি হননি। স্পিভাক প্রশ্ন চেয়েছিলেন ছাত্রছাত্রীদের কাছ থেকেই, আর পশ্চিমবঙ্গের পশ্চিম প্রান্তে ভূমিহীন দলিতদের মধ্যে তিনি পড়াচ্ছেন ১৯৮৬ থেকে। তবু উপমার যেটুকু খাটে, সেটুকুই বেশি বিঁধে থাকে। গুরুর কাছে আগে ছাত্রের পরিচয়, প্রশ্ন তার পরে। সেদিনের হলঘরেও কুমারকে প্রথমে বলতে হয়েছিল, তিনি কে।
ডু বয়েস নিজে কী চাইতেন
উচ্চারণের প্রশ্নে সবচেয়ে বড় সাক্ষী ডু বয়েস নিজেই। ১৯৩৯ সালে শিকাগো সানডে ইভনিং ক্লাবের আমন্ত্রণের জবাবে তিনি লিখেছিলেন, নামটা বলতে হবে পরিষ্কার ইংরেজি ধাঁচে। ‘ডু’-র উ যেমন ইংরেজি ‘সু’-তে, ‘বয়েস’-এর অয় যেমন ‘ভয়েস’-এ, আর জোর পড়বে দ্বিতীয় অক্ষরে। চিঠিটা উদ্ধৃত করেছেন ডু বয়েস-গবেষক অলডন মরিস। আরেকটা চিঠিও রয়ে গেছে, তাতে নামের উচ্চারণ তাঁর নিজের হাতে লেখা। খবরটা দিয়েছে ম্যাসাচুসেটস বিশ্ববিদ্যালয়ের ডু বয়েস সেন্টার।
তা হলে ফরাসি ছাপটা এল কোথা থেকে? পদবিটা এসেছে বাবার দিকের বংশ থেকে, ডু বয়েসের প্রপিতামহ ছিলেন ফরাসি বংশোদ্ভূত মার্কিন। বাবার জন্ম আবার হাইতিতে, আর হাইতি ছিল ফরাসি উপনিবেশ। সোজা কথায়, নামে ফরাসি ছাপ থাকলেও উচ্চারণটা মানুষটি নিজেই বেছেছিলেন। স্পিভাকের যুক্তিও এখানেই। পরে তিনি বলেছেন, কুমারের উচ্চারণের ঢং তিনি শোধরাচ্ছিলেন না, ফরাসিরা হাইতিকে উপনিবেশ বানিয়েছিল বলে গোটা হলকে নামটা ঠিক বলতে বলছিলেন।
এর পাশে আরেকটা বাক্য রাখা যাক। ১৯০৩ সালে ‘দ্য সোলস অব ব্ল্যাক ফোক’ বইয়ে ডু বয়েস লিখেছিলেন, বিংশ শতাব্দীর সমস্যা হলো বর্ণরেখার সমস্যা, এশিয়া আর আফ্রিকায়, আমেরিকায় আর সাগরের দ্বীপে গাঢ় আর হালকা রঙের মানুষের সম্পর্কের সমস্যা। এশিয়ার নামটা তাঁর নিজের বাক্যেই আছে। যাঁর নাম নিয়ে দিল্লিতে তর্ক, তিনি একশো বছরেরও আগে রেখাটা টেনে এনেছিলেন আমাদের মহাদেশ পর্যন্ত। বাংলায় লিখতে গিয়ে ‘বর্ণ’ শব্দটায় এসে একটু থামতে হয়। সেদিনের হলঘরে আসলে দুটো রেখা ছিল। নামের তর্ক গায়ের রঙের রেখা নিয়ে, প্রশ্নটা জাতবর্ণের রেখা নিয়ে। প্রথমটায় ডু বয়েস স্পিভাকের পক্ষে। দ্বিতীয়টায় উচ্চারণ কিছুই প্রমাণ করে না।
একই বইয়ে ডু বয়েস লিখেছিলেন, সবসময় অন্যের চোখ দিয়ে নিজেকে দেখার এক অনুভূতির কথা। তিনি লিখছিলেন আমেরিকায় কৃষ্ণাঙ্গ হওয়ার ভার নিয়ে, দিল্লির এক খারাপ সকালের চেয়ে তা ঢের ভারী। তবু সেদিন দুজনকেই দেখা হয়েছিল অন্যের চোখে, আগে ভরা হলঘরের, পরে ক্লিপের দৌলতে গোটা দেশের।
বিদ্যাসাগরের বন্ধু, এক রাঁধুনি, এক বিধবা
এবার সেই প্রশ্ন। কুমার পরে এক্স-এ নিজেই সেটা লিখে দিয়েছেন। স্পিভাক নিজেকে মধ্যবিত্ত বলেন, অথচ বক্তৃতায় ডু বয়েসকে উচ্চবিত্ত অভিজাত বলেছেন। বিদ্যাসাগরের ঘনিষ্ঠ বন্ধু বিহারীলাল ভাদুড়ির প্রপৌত্রী হয়ে তিনি মধ্যবিত্ত হন কী করে? ভঙ্গিটা আক্রমণের। তথ্য নিয়েও তর্ক আছে, সে কথায় আসছি। কিন্তু প্রশ্নের ভেতরের বিষয়টা গুরুতর, আর সেটা আমাদের নিজেদের, কলকাতার।
স্পিভাক পরে দুটো দাবিই নাকচ করেছেন। তাঁর কথায়, ডু বয়েসকে অভিজাত তিনি বলেননি, বলেছিলেন শুধু যে ডু বয়েস দাস ছিলেন না। বিহারীলালের প্রপৌত্রীও তিনি নন, এ কথাও তাঁর। তাঁর বিশ্বাস, বিহারীলালই তাঁর আসল প্রপিতামহ বা প্রমাতামহকে (কোন দিকের, স্পিভাক বলেননি) এক বিধবাকে বিয়ে করতে বলেছিলেন। সেই পূর্বপুরুষ তখন এক মধ্যবিত্ত পরিবারে রাঁধুনির কাজ করতেন। এ কথাতেও স্পিভাক নিজে নিশ্চিত নন। ইংরেজি উইকিপিডিয়ায় স্পিভাকের পাতা আবার বিহারীলালকে বলছে তাঁর চার পুরুষ আগের মানুষ, হোমিওপ্যাথির সমর্থক এক চিকিৎসক। অন্যত্র স্পিভাক নিজেও তাঁকে মায়ের দিকের পূর্বপুরুষ বলেছেন, এমন বিবরণও আছে। বিবরণগুলো একে অন্যের সাথে মেলে না।
কোনটা ঠিক, সে মীমাংসার দরকারও ততটা নেই। কারণ বংশের তর্কটা আসলে শ্রেণির তর্ক। কুমার দেখাচ্ছেন বিদ্যাসাগরের বন্ধুকে, স্পিভাক দেখাচ্ছেন এক রাঁধুনিকে। অথচ স্পিভাকের নিজের বয়ান মানলেও তাঁর পরিবারের গল্প গিয়ে ঠেকে ঠিক সেই জিনিসে, যার জন্য বিদ্যাসাগরের আন্দোলন। এক মধ্যবিত্ত বাড়ির রাঁধুনি এক বিধবাকে বিয়ে করছেন, তাঁর স্মৃতি ঠিক হলে বিদ্যাসাগরের বন্ধুর কথায়। বিয়েটা কবে হয়েছিল, স্পিভাক বলেননি, আন্দোলনের সাথে তার সরাসরি যোগের কথাও এই বিবরণগুলোর কোনওটাতে নেই। তবু আইনের খাতায় যে অধিকারের জন্য লড়াই, এমন গল্পে সেটা একটা মানুষের সংসার।
আইনটা ১৮৫৬ সালের পঞ্চদশ আইন, হিন্দু বিধবা পুনর্বিবাহ আইন, পাশ হয় সে বছরের জুলাইয়ে। প্রচারের সবচেয়ে বড় মুখ বিদ্যাসাগর, আইনসভায় আবেদনও পাঠিয়েছিলেন তিনিই। উল্টো দিকে রাধাকান্ত দেব আর ধর্মসভার পাল্টা আবেদন। সই গুনলে সংস্কারের পক্ষে একজন হলে বিপক্ষে প্রায় চারজন। লর্ড ডালহৌসি তবু বিলটা চূড়ান্ত করলেন। এই অঙ্কটা মাথায় রাখলে এক বিধবার সাথে এক রাঁধুনির বিয়ে আর ছোট ঘটনা থাকে না।
বিদ্যাসাগর নিজে ব্রাহ্মণ পরিবারের ছেলে, জন্ম ১৮২০ সালে মেদিনীপুরের বীরসিংহে। যে কলেজে পড়েছিলেন, সেই কলকাতার সংস্কৃত কলেজই তাঁকে ‘বিদ্যাসাগর’ উপাধি দেয়। ১৮২৪ সালের ১ জানুয়ারি তৈরি কলেজটা সাতাশ বছর চলেছিল কোনও অধ্যক্ষ ছাড়াই। ১৮৫১ সালে অধ্যক্ষ হয়ে বিদ্যাসাগর ব্রাহ্মণ আর বৈদ্য ছাড়া অন্য জাতের ছাত্রদেরও ভর্তি নিতে শুরু করলেন। বৃন্দা বসুর মনে আছে, সেদিনের বক্তৃতায় স্পিভাক নিজের শিক্ষক বলে যাঁর নাম করেছিলেন, সেই বিমলকৃষ্ণ মতিলাল পরে তালিম নেন এই কলেজেরই পণ্ডিতদের কাছে, পড়িয়েওছেন এখানে, ১৯৫৭ থেকে ১৯৬২। সুতোটা সেদিনের মঞ্চ পর্যন্ত গড়িয়েছে।
ছবিটার উল্টো পিঠও আছে, ইংরেজি উইকিপিডিয়ায় বিদ্যাসাগরের পাতায়। ১৮৫৪ সালে এক ধনী সুবর্ণবণিকের সংস্কৃত কলেজে ভর্তিতে তিনি আপত্তি তুলেছিলেন। তাঁর যুক্তি, জাতের সিঁড়িতে সোনার বেনেরা অনেক নীচে। ১৮৫৯ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর ছোটলাট জন পিটার গ্রান্টকে লেখা চিঠিতে তাঁর পরামর্শ ছিল, সরকার বরং বড় আকারে ‘উচ্চতর শ্রেণি’-র শিক্ষাতেই মন দিক। চিঠির কথাটা ‘শ্রেণি’, তাকে জাত বলে পড়েছেন পাতাটির সম্পাদকেরা।
একই মানুষ দরজা খুললেন, আবার কে ঢুকবে সেটাও বেছে দিলেন। বিদ্যাসাগরকে ছোট করতে কথাটা বলা নয়। বিধবার বিয়ের জন্য যিনি প্রায় চার গুণ সইয়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন, তাঁর সাহস নিয়ে প্রশ্ন ওঠে না। প্রশ্নটা অন্য। বাঙালি ভদ্রলোকের যে ‘মধ্যবিত্ত’ পরিচয় আমাদের এত চেনা, তার গোড়ায় সংস্কারও আছে, জাতের গণ্ডিও আছে। কুমারের প্রশ্নটা রুক্ষভাবে করা, তার তথ্য নিয়েও তর্ক চলে। তবু সেটা আঙুল তুলেছিল ঠিক এই ইতিহাসের দিকে। হলটা সেটা শুনল না, শুনল একটা উচ্চারণ।
চার দিন পর ছাপা হলো স্পিভাকের জবাব
জবাবটা বেরোল ২৫ মে, দ্য হিন্দু-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে। তাতে আঘাত আছে, আবার নিজের একটা যুক্তিও আছে। স্পিভাকের বয়ানে, কুমার নিজেকে দলিত বলে পরিচয় দেননি। ব্রাহ্মণ-চর্চার প্রতিষ্ঠান গড়েছেন শুনে তাঁকে ব্রাহ্মণ্যবাদী ধরে নিয়েছিলেন। প্রশ্ন করতেও বাধা দেননি। তিনি তখন এক বয়স্ক শিক্ষিকা, মুখোমুখি এক পুরুষ ছাত্র, আর ছাত্রটি যে দলিত, সে খবর তাঁকে কেউ দেয়নি। প্রশ্ন শুনতে চান না, আহত হয়ে এই যে কথাটা বলেছিলেন, সেটাকে তিনি বললেন প্রতিবাদ। দুটো কথা পাশাপাশি রাখলে একটু খটকা লাগে। প্রশ্ন করতে বাধা দেননি, অথচ প্রশ্নটা শুনতে চাননি। তাঁর পরামর্শ, ডু বয়েস যেহেতু নিজেই ছিলেন এক কৃষ্ণাঙ্গ ‘দলিত’, নামটার ঠিক উচ্চারণ শিখে নেওয়া হোক।
তার পরের কথাগুলো ঝগড়ার চেয়ে ভারী। তাঁর মতে, সাবঅল্টার্ন আর দলিত সমার্থক নয়। বিশ্ববিদ্যালয় শ্রেণির সিঁড়ি বেয়ে ওঠার একটা হাতিয়ার, আর সেই সিঁড়ি বেয়ে ওঠা দলিত মানুষ নতুন সুবিধা কাজে লাগাবেন গোটা দলিত সমাজের জন্য, এমনটাই তাঁর প্রত্যাশা। নিজের কাজের কথাও মনে করিয়ে দিলেন, চল্লিশ বছর ধরে সাবঅল্টার্নদের জন্য প্রাথমিক স্কুল চালানোর কথা। একটা আক্ষেপও জুড়লেন: সাবঅল্টার্ন স্টাডিজ জাতের প্রশ্ন স্বীকার করে না বলে মনে হয় তাঁর। গোটা পর্বটাকে তিনি বললেন ‘অত্যন্ত শিক্ষণীয় অভিজ্ঞতা’।
বাকিদের মধ্যে যাঁরা দুজনকেই দায়ী করলেন, সবচেয়ে ধারালো কথা এল তাঁদের কাছ থেকেই। অজয় গুদাভার্তি এক মতামত-নিবন্ধে লিখলেন, লিঙ্গের দোহাই দিয়ে স্পিভাকের শোধরানো শেষে দাঁড়াল জাতের উন্নাসিকতায়, আর ছাত্রটির জাত-পরিচয়ের দাবিও মোড় নিল নারীবিদ্বেষে। হলে বসে থাকা জেএনইউ-র গবেষক জর্জ চাকমার চোখে পুরোটা দুই সমস্যাজনক মানুষের কথোপকথন। অন্যরা কোনও একটা পক্ষ নিলেন। কবি মীনা কান্দাসামি মনে করিয়ে দিলেন সহজ একটা নিয়ম, উচ্চারণ নিয়ে কাউকে হেনস্থা করা চলে না, ঠিক উচ্চারণটা আলগোছে গুঁজে দিতে হয়। বৃন্দা বসু লিখলেন, ঝড় তুলেছিলেন এমন অনেকে, যাঁরা হলে ছিলেনই না। তর্কটা চালালেন শিক্ষাবিদ, লেখক আর সাংবাদিকেরাই। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ, কোনও রাজনৈতিক দল বা ছাত্র সংগঠনের কোনও বিবৃতির খবর নেই।
ডিরোজিওর কলেজ, স্পিভাকের কলেজ
কলকাতায় প্রশ্ন করতে শেখানোর ইতিহাসও পুরোনো, আর তার দামও কম নয়। ১৮১৭ সালে তৈরি হিন্দু কলেজে বিশের দশকের শেষে ইংরেজি সাহিত্য আর ইতিহাস পড়াতে এলেন হেনরি লুই ভিভিয়ান ডিরোজিও। জন্ম কলকাতাতেই, ১৮০৯ সালের এপ্রিলে। ছাত্রদের তিনি শেখালেন খোলা মনে ভাবতে, প্রশ্ন করতে, কিছুই চোখ বুজে না মানতে। ১৮২৮ সালে সেই ছাত্রদের নিয়ে গড়লেন তর্কসভা, অ্যাকাডেমিক অ্যাসোসিয়েশন। নামটা মনে রাখার মতো। প্রায় দুশো বছর পরে জেএনইউ-র সেই বক্তৃতার আয়োজকও নিজেদের নাম রেখেছে ‘জেএনইউ অ্যাকাডেমিক’। ডিরোজিওর ছাত্রদেরই পরে লোকে ডাকত ‘ইয়ং বেঙ্গল’।
রক্ষণশীল হিন্দু অভিভাবকেরা আপত্তি তুললেন, আর ১৮৩১ সালের এপ্রিলে ডিরোজিওকে সরে যেতে হলো। এইচ এইচ উইলসনকে লেখা চিঠিতে তিনি নিজেই লিখেছিলেন, “আমার পদত্যাগ বাধ্যতামূলক।” সে বছরের ডিসেম্বরে কলেরায় মারা গেলেন, বয়স তখন ২২। যে ছাত্রের প্রশ্ন সেদিন জেএনইউ-তে শোনা হলো না, তাঁর চেয়েও ছ’বছর কম।
সেই হিন্দু কলেজই ১৮৫৫ সালে সরকারের হাতে গিয়ে হলো প্রেসিডেন্সি কলেজ, আজকের কলেজ স্ট্রিটের প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়। এখানে স্নাতক পড়েছিলেন রণজিৎ গুহ, আর এখান থেকেই ১৯৫৯ সালে স্নাতক হন স্পিভাক। ১৯৮২ সালে গুহর সম্পাদনায় বেরোয় ‘সাবঅল্টার্ন স্টাডিজ’-এর প্রথম খণ্ড। ১৯৮৮ সালে দুজনে মিলে সম্পাদনা করেন ‘সিলেক্টেড সাবঅল্টার্ন স্টাডিজ’। ডিরোজিওকে যে কলেজ ছাড়তে হয়েছিল, দেড়শো বছর পরে তারই দুই প্রাক্তনী হয়ে উঠলেন সাবঅল্টার্ন স্টাডিজের দুই চেনা নাম।
তাই সেদিনের হলঘরের ব্যর্থতাটা একটু বেশিই বাজে। দোষ কেবল স্পিভাকের নয়। সঞ্চালক পরের প্রশ্নে চলে গেলেন, ক্লিপ ছড়াল গালি সমেত, তর্ক গড়াল উচ্চারণ আর ভদ্রতা নিয়ে। যে ছাত্র প্রশ্নটা এনেছিলেন, শেষে নিজের গালিতেই তিনি সেটা চাপা দিলেন।
ফেরা যাক জুলিয়েটের প্রশ্নে। নামে কী আসে যায়? ডু বয়েসের কাছে অনেকটাই, নিজের নামের উচ্চারণ তিনি নিজেই বেছে নিয়েছিলেন। অংশুল কুমারের প্রশ্নটাও ছিল তেমনই, রুক্ষ, আধখানা, তবু তাঁর নিজের। নাম শুধরে দিতে লাগে এক মিনিট, প্রশ্ন শুনতে আরেকটু ধৈর্য। সেদিন হলঘরে প্রথমটা হলো বারবার, দ্বিতীয়টা একবারও না।
তথ্যসূত্র (১১)
- গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক (Gayatri Chakravorty Spivak), ইংরেজি উইকিপিডিয়া। দেখা হয়েছে ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬।
- ডব্লিউ ই বি ডু বয়েস (W. E. B. Du Bois), ইংরেজি উইকিপিডিয়া। দেখা হয়েছে ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬।
- ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর (Ishwar Chandra Vidyasagar), ইংরেজি উইকিপিডিয়া। দেখা হয়েছে ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬।
- হিন্দু বিধবা পুনর্বিবাহ আইন, ১৮৫৬ (Hindu Widows' Remarriage Act, 1856), ইংরেজি উইকিপিডিয়া। দেখা হয়েছে ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬।
- সংস্কৃত কলেজ (Sanskrit College and University), ইংরেজি উইকিপিডিয়া। দেখা হয়েছে ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬।
- হেনরি লুই ভিভিয়ান ডিরোজিও (Henry Louis Vivian Derozio), ইংরেজি উইকিপিডিয়া। দেখা হয়েছে ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬।
- টমাস এডওয়ার্ডস, ‘হেনরি ডিরোজিও, দ্য ইউরেশিয়ান, পোয়েট, টিচার, অ্যান্ড জার্নালিস্ট’ (কলকাতা, ১৮৮৪), ইন্টারনেট আর্কাইভ। দেখা হয়েছে ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬।
- প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়, কলকাতা (Presidency University, Kolkata), ইংরেজি উইকিপিডিয়া। দেখা হয়েছে ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬।
- একলব্য (Ekalavya), ইংরেজি উইকিপিডিয়া। দেখা হয়েছে ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬।
- সাবঅল্টার্ন স্টাডিজ (Subaltern Studies), ইংরেজি উইকিপিডিয়া। দেখা হয়েছে ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬।
- রণজিৎ গুহ (Ranajit Guha), ইংরেজি উইকিপিডিয়া। দেখা হয়েছে ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬।
মুড কলকাতাকে ফলো করুন
এমন লেখা, নতুন গল্প আর গান এলেই খবর পাবেন।


