
উৎসব
ভূত চতুর্দশী ২০২৬: চোদ্দ শাক, চোদ্দ প্রদীপ, আর সে রাতের গল্প
ভূত চতুর্দশী এ বছর শনিবার, ৭ নভেম্বর। দুই পঞ্জিকা মিলিয়ে তিথির সময়, চোদ্দ শাকের দুটো আলাদা তালিকা, চোদ্দ প্রদীপ কাদের জন্য, আর সে রাতে শোনার মতো তিনটি গল্প।
এই লেখায় (৪)
বাজারের থলেতে সবুজের স্তূপ। ওল, সরষে, হিঞ্চে, কলমি, আরও দশটা নাম। তার অর্ধেক মা নিজেও বাজারওয়ালাকে জিজ্ঞেস করে চেনেন। দুপুরের পাতে এক খাবলা তেতো-মেশানো শাকভাজা। বিকেল ফুরোতে না ফুরোতেই ছাদে, সিঁড়ির বাঁকে, কলঘরের দরজায়, তুলসীতলায় একটা একটা করে প্রদীপ। গুনলে চোদ্দটা।
নামটা ভূতের, অথচ এ দিনে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। যাঁদের আসার কথা, তাঁরা এ বাড়ির লোক।
ভূত চতুর্দশী ২০২৬ কবে
ভূত চতুর্দশী এ বছর শনিবার, ৭ নভেম্বর ২০২৬। দুটো পঞ্জিকাই এক কথা বলছে। দৃকপঞ্জিকার কলকাতার পাতায় চতুর্দশী লাগছে শনিবার বেলা ১০টা ৪৭ মিনিটে, ছাড়ছে রবিবার, ৮ নভেম্বর বেলা ১১টা ২৭-এ। বিশুদ্ধ সিদ্ধান্ত পঞ্জিকায় দু মিনিট পরে, ১০টা ৪৯ থেকে ১১টা ২৯। রবিবার চতুর্দশী ছাড়তেই অমাবস্যা, আর সেই রাতে কালীপুজো।
তিথি তো দুদিন জুড়ে, তাহলে শনিবার কেন? বিশুদ্ধ সিদ্ধান্ত পঞ্জিকা উত্তরটা দিয়েছে এক লাইনে। এই চতুর্দশী ধরা হয় প্রদোষকালের নিয়মে, মানে সূর্য ডোবার ঠিক পরে তিথি থাকা চাই। দৃকপঞ্জিকার সেদিনের পাতার হিসেবে শনিবার কলকাতায় সূর্য ডুবছে বিকেল ৪টে ৫৬ মিনিটে। চতুর্দশী তখন পুরোদমে চলছে। রবিবার সন্ধে নামার আগেই তিথি ছেড়ে গেছে। তাই প্রদীপ জ্বলবে শনিবার সন্ধেয়।
চোদ্দ প্রদীপ কাদের জন্য
বাংলায় কথাটা আমরা রোজ বলি, রাগ হলে তো আরও বেশি: চোদ্দ পুরুষ। এই রাতের প্রদীপ সেই চোদ্দ পুরুষের জন্য। বাংলা উইকিপিডিয়া লিখছে, প্রদীপগুলো জ্বালা হয় চতুর্দশ ঊর্ধ্বতন পূর্বপুরুষের উদ্দেশে, আর বিশ্বাস, অমাবস্যার আগের এই অন্ধকার রাতে তাঁরা আত্মীয়দের দেখতে নেমে আসেন। আলো দেখে তাঁরা বাড়ি চিনবেন। বাড়ির অন্ধকার কোণ থেকে খারাপ যা কিছু, আলোয় পালাবে।
‘ভূত’ শব্দের আরেক মানে অতীত, ব্যাকরণের ভূতকাল। চলে যাওয়া মানুষেরাও সেই অতীতের। এ রাতের ভূত তাই মুখোশ-পরা ভয় নয়। তিনি ঠাকুরদার বাবা, তাঁর বাবা। তাঁদের নাম কেউ মনে রাখেনি। তবু বছরে একটা সন্ধে তাঁদের জন্য সিঁড়িতে প্রদীপ রাখা থাকে।
আরও একটা মত আছে, সেটাও উইকিপিডিয়াতেই লেখা। এই দিন কালী চামুণ্ডা রূপে চোদ্দটা ভূত সাথে নিয়ে নামেন, ভক্তের বাড়ি থেকে অশুভ তাড়াতে। দুটো কাহিনি পাশাপাশি থাকুক। কোনটা ঠিক, সে তর্ক এ রাতে তোলার মানে হয় না।
চোদ্দ শাক: দুটো তালিকা, মিল মাত্র পাঁচে
এখানেই মজা। ‘চোদ্দ শাক’ সবাই জানে, কিন্তু কোন চোদ্দটা, জিজ্ঞেস করলে দুই বাড়ির উত্তর মেলে না। মেলার কথাও নয়, কারণ ছাপা তালিকাগুলোই মেলে না।
পুরোনো তালিকাটি বাংলা উইকিপিডিয়া দিয়েছে ষোড়শ শতকের স্মার্ত পণ্ডিত রঘুনন্দনের ‘কৃত্যতত্ত্ব’ ধরে: ওল, কেও, বেতো, কালকাসুন্দা, নিম, সরষে, শালিঞ্চা, জয়ন্তী, গুলঞ্চ, পলতা, ঘেঁটু, হিঞ্চে, শুষনি, শেলু। পড়লেই বোঝা যায়, এর অনেকটা শাক নয়, ওষুধের তাক। নিম, গুলঞ্চ, কালকাসুন্দা, পলতা, স্বাদে সবই তেতো।
বিশুদ্ধ সিদ্ধান্ত পঞ্জিকার পাতায় তালিকাটা অন্য: পালং, মেথি, সরষে, নটে, শালুক, হেলেঞ্চা, কলমি, ঘেঁটু, সাঁচি, গিমে, ভাটপাতা, শুষনি, হিঞ্চে আর ওল। এর বেশির ভাগই রোজের রান্নাঘরের চেনা শাক, ওষুধের তাক নয়।
| তালিকা | শাক | দুটোতেই আছে |
|---|---|---|
| রঘুনন্দনের ‘কৃত্যতত্ত্ব’ ধরে (বাংলা উইকিপিডিয়া) | ওল, কেও, বেতো, কালকাসুন্দা, নিম, সরষে, শালিঞ্চা, জয়ন্তী, গুলঞ্চ, পলতা, ঘেঁটু, হিঞ্চে, শুষনি, শেলু | ওল, সরষে, ঘেঁটু, হিঞ্চে, শুষনি |
| বিশুদ্ধ সিদ্ধান্ত পঞ্জিকা | পালং, মেথি, সরষে, নটে, শালুক, হেলেঞ্চা, কলমি, ঘেঁটু, সাঁচি, গিমে, ভাটপাতা, শুষনি, হিঞ্চে, ওল | ওল, সরষে, ঘেঁটু, হিঞ্চে, শুষনি |
কেন এই শাক? উইকিপিডিয়া লিখছে, আশ্বিন আর কার্তিক, বাংলার ঋতুবদলের এই দুই মাসকে একসময় বলা হত যমদংষ্ট্রা কাল, যমের দাঁতের কাল। বিশ্বাস ছিল, এই সময় শাক খেলে রোগ কাছে ঘেঁষে না। শরীরের হিসেব আমরা ডাক্তারের জন্য রেখে দিই। তবে জোড়টা লক্ষ করুন। দুপুরে যমের দাঁত ঠেকাতে তেতো নিম, সন্ধেয় চোদ্দ পুরুষের পথে প্রদীপ, একই দিনে, একই বাড়িতে।
প্রদীপ জ্বলে গেলে, সে রাতের গল্প
প্রদীপ দেওয়া হয়ে গেলে বাকি সন্ধেটা বাঙালির চিরকালের, ভূতের গল্পের। এ রাতে আমরা এই তিনটে চালাতে বলব।
১:০৮:৪১শুনুন: জোকাবুড়ির দহজোকাবুড়ির দহ
THRILLER LAND
থ্রিলার ল্যান্ডের ভূত চতুর্দশীর গল্প, নামের পাশে রণদীপ নন্দী। বারো-তেরো বছর পর পৈতৃক বাড়ি বেচতে গ্রামে ফেরে রণজয়, জেঠু রাজি নন। আপত্তির কারণ বংশের কুলদেবী। তিনি চাইলে দেন, আবার কেড়েও নেন। ১ ঘণ্টা ৯ মিনিট, অক্টোবর ২০২৪।
১:০৫:৪১শুনুন: গদ্রবঙ্গাগদ্রবঙ্গা
THRILLER LAND
অন্তরা বিশ্বাসের কলমে, থ্রিলার ল্যান্ডেরই ভূত চতুর্দশীর পর্ব। নন্দীপুরের জমিদারবাড়ির উপর এক সাঁওতালি অপদেবতার অভিশাপ। ১ ঘণ্টা ৬ মিনিট, নভেম্বর ২০২৩।
৫৭:০৭শুনুন: কালীগুণীন ও দানবের মণিকালীগুণীন ও দানবের মণি
BIVA Cafe
বিভা ক্যাফের দীপাবলি স্পেশাল, কালীগুণীন সিরিজের গল্প, নামের পাশে সৌমিক দে। তন্ত্রের গল্প। পরদিন কালীপুজো, তার আগের রাতে এটাই মানায়। ৫৭ মিনিট, নভেম্বর ২০২০।
রাত আরও লম্বা হলে তারানাথ তান্ত্রিক কোথা থেকে শুরু করবেন, সেটাও লিখে রেখেছি। পরদিন সন্ধের আগে দেখে নিন কালীপুজো ২০২৬-এর তারিখ আর নিশীথের সময়।
প্রদীপগুলো রাতভর জ্বলবে না, তেল ফুরোবে। তাতে ক্ষতি নেই। যাঁদের জন্য জ্বালা, তাঁরা পথ চিনে নিয়েছেন বহু আগেই।
তথ্যসূত্র (৪)
- Kali Chaudas 2026, Kolkata, দৃকপঞ্জিকা। দেখা হয়েছে ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬।
- Day Panchang, 7 November 2026, Kolkata, দৃকপঞ্জিকা। দেখা হয়েছে ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬।
- ভূত চতুর্দশী, বাংলা উইকিপিডিয়া। দেখা হয়েছে ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬।
- Naraka Chaturdashi, উইকিপিডিয়া। দেখা হয়েছে ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬।
মুড কলকাতাকে ফলো করুন
এমন লেখা, নতুন গল্প আর গান এলেই খবর পাবেন।


