
কলকাতা
কলকাতার ভুতুড়ে জায়গা: লোকমুখের গল্প আর নথির হিসেব
গার্স্টিন প্লেসে বেতারের প্রথম ঠিকানা, সাউথ পার্ক স্ট্রিট গোরস্থান, রাইটার্স বিল্ডিং আর নিমতলা ঘাট। চার জায়গা, চারটে ভূতের গল্প। পঞ্চম জায়গা জাতীয় গ্রন্থাগার। সেখানে আমরা ভূত খুঁজব না, খুঁজব সত্যিকারের একটা দরজাহীন ঘর। প্রত্যেকটার কিংবদন্তি শুনুন, তারপর মিলিয়ে নিন নথির সাথে।
এই লেখায় (৬)
সাল ১৭৬৭। একটা গোরস্থান খুলল, সেখানে পৌঁছোতে কাটা হল নতুন রাস্তা। দশ বছর পর, ১৭৭৭ সালে, কোম্পানির কেরানিদের জন্য উঠল দপ্তরবাড়ি। বড়লাটেরা যে বাড়িতে থাকতেন, সেটা একদিন হয়ে গেল লাইব্রেরি। গঙ্গার ধারে শ্মশানঘাট তো ছিলই। আর ছিল একটা বেতারকেন্দ্র, যদিও সে বাড়ি আজ আর নেই। প্রত্যেকটার গায়ে লেগে আছে একটা করে গল্প। কোথাও এক সাহেব, বাড়ি ফেরা হয়নি তাঁর। কোথাও কবরের সারির ফাঁকে সৈন্যেরা। কোথাও কেরানিদের অলিন্দে মৃতেরা।
গল্পগুলো সত্যি কি না, সে প্রশ্নের উত্তর সোজা: প্রমাণ কেউ কোনওদিন দেখাতে পারেননি। মজার প্রশ্নটা অন্য। ভূতের গল্পগুলো বেছে বেছে এই বাড়িগুলোতেই জমল কেন? একটা একটা করে ঘোরা যাক। প্রতিটা জায়গায় আগে শুনব লোকে কী বলে, তারপর দেখব নথিতে কী লেখা।
১ নম্বর গার্স্টিন প্লেস: বেতার চলে গেল, সাহেব রয়ে গেলেন
কলকাতা যত ভূতের গল্প বলে, তার মধ্যে সবচেয়ে রসিয়ে বলে এটাই। তাই শুরু এখান থেকে। ১৯২৭ সালে এই ঠিকানায় চালু হয় কলকাতার বেতারকেন্দ্র। বাড়িটার বদনামও ছিল, ভূতের বদনাম। লোকে বলে, সেই ভূত এক সাহেব। সানডে সাসপেন্সের একটা গল্পের নামেও তিনি ‘সাহেব ভূত’। বেতার একদিন ঠিকানা বদলাল। ইংরেজ ভদ্রলোক নাকি রয়ে গেলেন ওই বাড়িতেই। তাঁকে পাওয়া যায় শুধু গল্পে। গল্পের চেয়ে পুরোনো কোনও লেখায় তাঁর খোঁজ মেলেনি।
নথির গল্প ঢের সাদামাটা। বাংলা উইকিপিডিয়ায় আকাশবাণী কলকাতার পাতা বলছে, কেন্দ্রটির উদ্বোধন ১৯২৭ সালের ২৬ অগস্ট, ১ নম্বর গার্স্টিন প্লেসে। ভারতের দ্বিতীয় প্রাচীনতম বেতারকেন্দ্র এটাই। পরে কেন্দ্র সরে যায় ইডেন গার্ডেন্সের কাছে আজকের আকাশবাণী ভবনে, কিন্তু কোন বছরে, তা নিয়ে দুই মত। উইকিপিডিয়ার ওই পাতায় সালটা ১৯৫৮, অন্য এক সূত্রে ১৯৬১। আমাদের মহালয়ার লেখাতেও দুটো সালই রাখা আছে। বাড়িটা আর নেই। টিকে আছে শুধু ভূতের গল্পটা।
তবু এই ঠিকানাটা বাঙালির কাছে আলাদা, আর তার কারণ ভূত নয়। ‘মহিষাসুরমর্দিনী’ প্রথম সরাসরি হয়েছিল এই কেন্দ্রেই, ভোরের আলো ফোটার আগে। মাইক্রোফোনের সামনে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র। ওই বাড়ি নিয়ে মির্চি বাংলার সানডে সাসপেন্স ক্লাসিকসে ছোট্ট একটা ভূতের গল্প আছে। তার শিরোনামেও জুড়ে আছে তাঁরই নাম।
৮:৩০শুনুন: গার্স্টিন প্লেসের সাহেব ভূতগার্স্টিন প্লেসের সাহেব ভূত
Mirchi Bangla
সানডে সাসপেন্স ক্লাসিকসের গল্প, শিরোনামে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের নাম। চলে সাড়ে আট মিনিট। আমরা বলব, সবার শেষে শুনুন, ঘরের আলো নিভিয়ে।
সাউথ পার্ক স্ট্রিট গোরস্থান: সৈন্য নয়, মনে থাকেন এক মা
উইকিপিডিয়ার ‘ভারতের ভুতুড়ে বলে কথিত জায়গা’র তালিকা গোরস্থানটাকে সেরেছে এক লাইনে: এখানে ব্রিটিশ সৈন্যদের কবর, আর ভূত হয়ে তাঁরাই নাকি ঘোরেন। কিংবদন্তি বলতে এটুকুই। শীতের এক বিকেলে সমাধির সারির ফাঁকে খানিক হাঁটুন, বাকিটা মন নিজেই বানিয়ে নেবে।
নথি এর চেয়ে অনেক জমাটি, আর সেটা আছে গোরস্থানের নিজের উইকিপিডিয়া পাতায়। ১৭৬৭ সালে গোরস্থান খোলার সময় সেখানে পৌঁছোতে তৈরি হয় নতুন একটা রাস্তা, বেরিয়াল গ্রাউন্ড রোড। সেই রাস্তাই পরে হল পার্ক স্ট্রিট। এই মাটিতে শুয়ে আছেন হেনরি লুই ভিভিয়ান ডিরোজিও, ইয়ং বেঙ্গলের তরুণ শিক্ষক। আছেন এশিয়াটিক সোসাইটির প্রতিষ্ঠাতা স্যর উইলিয়াম জোন্সও। আর আছে ৩৬৩ নম্বর কবর, ১৮২৫ সালে মারা যাওয়া এক অজানা মহিলার। ফলকে লেখা শুধু ‘এক সাধ্বী মা’। ১৯৮৪ সালে আর্টস সেন্টার বানাতে গোরস্থানের একাংশ প্রায় সাফ হয়ে যেতে বসেছিল। কলকাতা হাইকোর্ট সেটা আটকায় ঠিকই, কিন্তু ততদিনে বহু কবর হারিয়ে গেছে।
ঘুরে আসার পর মনে থেকে যান সেই অজানা মহিলাই। দুশো বছর পেরিয়ে গেছে, তাঁর ভাগে প্রশংসার একটা মাত্র লাইন। ওই বাগানে আজও যদি কেউ অপেক্ষায় থাকেন, তিনি কোনও সৈন্য নন।
৯:০৭শুনুন: পার্ক স্ট্রিটের হারানো গোরস্থানপার্ক স্ট্রিটের হারানো গোরস্থান
Half Pant History
হাফ প্যান্ট হিস্ট্রি শোনাচ্ছে কলকাতার হারিয়ে যাওয়া গোরস্থানগুলোর কথা, আর পার্ক স্ট্রিটের পুরোনো নামটা কোথা থেকে এল। শুনতে লাগে ন’মিনিট।
সাউথ পার্ক স্ট্রিট গোরস্থান
পার্ক স্ট্রিট (মাদার টেরিজা সরণি), মধ্য কলকাতা
১৭৬৭ সালে খোলা, পার্ক স্ট্রিটের সবচেয়ে পুরোনো গোরস্থানগুলোর একটি। ডিরোজিও আর স্যর উইলিয়াম জোন্স শুয়ে আছেন এখানেই। স্তম্ভ আর সমাধিসৌধে ভরা এক বাগান, হইচইয়ের রাস্তার মাঝখানে একটুকরো নিস্তব্ধতা।
- খোলা হয়
- ১৭৬৭
- কাছের মেট্রো
- পার্ক স্ট্রিট, ব্লু লাইন
জাতীয় গ্রন্থাগার: দরজাহীন ঘরে মিলল শুধু মাটি
২০১০ সাল, আলিপুরের বেলভেডিয়ার এস্টেট। একসময় এখানে থাকতেন বড়লাটেরা, ১৯৫৩ সাল থেকে এখানে জাতীয় গ্রন্থাগার। সংস্কৃতি মন্ত্রকের হয়ে বাড়িটা সারাচ্ছেন ভারতীয় প্রত্নতাত্ত্বিক সর্বেক্ষণের ইঞ্জিনিয়াররা। একতলায় তাঁরা পেলেন একটা ঘর। সে ঘরের কথা কেউ জানত না। মাপে মোটামুটি ১,০০০ বর্গফুট, অথচ কোনও দিকে একটা ফোকরও নেই। ওপরতলায় চোরা দরজার খোঁজ চলল। মিলল না। শুনতে রহস্য উপন্যাসের প্রথম পাতার মতো। কিন্তু কারও বানানো নয়, এ গল্প উইকিপিডিয়ায় লেখা আছে। এবার গল্প বলছে নথি নিজেই।
শহর কী রটাল, সহজেই আন্দাজ করা যায়। কারও মতে ওয়ারেন হেস্টিংসের শাস্তির ঘর, কারও মতে গুপ্তধনের কুঠুরি। ২০১১ সালে জবাব মিলল, আর ভূতের গল্পের পক্ষে এর চেয়ে হতাশার জবাব হয় না: ঘরভর্তি মাটি। সম্ভবত বাড়িটাকে মজবুত রাখতেই ঠেসে ভরা হয়েছিল। তবু আমাদের চোখে এ শহরের কোনও ভূতের গল্প এর ধারেকাছে আসে না। মাসের পর মাস কলকাতার হাতে ছিল একটা বন্ধ ঘর, অথচ ভেতরে কী আছে, কেউ জানত না। ভূতের গল্প তো এভাবেই শুরু হয়।
১২:৩০শুনুন: ন্যাশনাল লাইব্রেরির অজানা ইতিহাসন্যাশনাল লাইব্রেরির অজানা ইতিহাস
Half Pant History
১৮৩৬ সালের ক্যালকাটা পাবলিক লাইব্রেরি কীভাবে ইম্পিরিয়াল লাইব্রেরি হয়ে শেষে জাতীয় গ্রন্থাগার হল, সেই গল্প সাড়ে বারো মিনিটে বলেছে হাফ প্যান্ট হিস্ট্রি।
রাইটার্স বিল্ডিং: কেরানির দপ্তর হয়ে উঠল ক্ষমতার আসন
রাইটার্সের কিংবদন্তি যেন ইচ্ছে করেই আবছা। উইকিপিডিয়ার তালিকা শুধু এটুকু জানায়: বিবাদী বাগের কাছের এই বাড়ি নিয়ে নানা গল্প চালু আছে, সেখানে নাকি মৃতদের আনাগোনা। পুরোনো যে কোনও অফিসে এমন গল্প একটা থাকেই। সেটা শোনা যায় তাঁর মুখে, রাতে যিনি সবার শেষে তালা দেন।
রাইটার্স বিল্ডিং-এর নকশা করেছিলেন টমাস লায়ন, ১৭৭৭ সালে। বাড়িটা তৈরি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ‘রাইটার’দের জন্য, মানে কোম্পানির ছোট কেরানিদের। জমিটায় ১৭৫৬ পর্যন্ত দাঁড়িয়ে ছিল পুরোনো ফোর্ট উইলিয়াম। পরের একশো বছরে কেরানির দপ্তর হয়ে উঠল বাংলায় ব্রিটিশ সরকারের সদর। ১৯৪৭ থেকে ২০১৩ পর্যন্ত এখানে বসেছে পশ্চিমবঙ্গ সরকার। ২০২৬ সালে নতুন রাজ্য সরকার জানাল, তারা আবার এখানেই ফিরবে। এত কাগজ আর এত ক্ষমতা যে বাড়ি ধরে রেখেছে, তার অলিন্দে দু-চারটে গল্প জমবে, সেটাই স্বাভাবিক।
নিমতলা ঘাট: শোকের জায়গা চায় নীরবতা
নিমতলা নিয়েও তালিকার রায় এক লাইনের: ঘাটটা নাকি ভুতুড়ে। গঙ্গার ধারের শ্মশান। বাংলা যতদিন গল্প বলছে, শ্মশানের গল্পও ততদিনের। ও কথায় আমরা বেশিক্ষণ দাঁড়াব না।
যা মনে রাখার, তা আছে নথিতে। নিমতলার প্রথম বাড়ি ওঠে ১৭১৭ সালে। আজকের কাঠামো তার একশো বছর পরের, ১৮১৭ সালে বাবু রাজচন্দ্র দাসের তৈরি। ১৯৪১ সালে রবীন্দ্রনাথের দাহ হয় এখানেই। রানি রাসমণি আর ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের শেষযাত্রাও থেমেছিল এই ঘাটে। চত্বরে রবীন্দ্রনাথের একটা স্মৃতিসৌধও আছে। মানুষ এখানে আসেন প্রিয়জনকে হারিয়ে। শোকের জায়গার পাওনা নীরবতা, ভূত-শিকার নয়।
ভূতেরা থাকেন শহরের গোড়ায়
তালিকাটায় আর একবার চোখ বোলান, একটা নকশা ধরা পড়বে। কলকাতা যেখানে যেখানে ভূত বসিয়েছে, প্রত্যেকটা জায়গা শহরের শুরুর দিনগুলোর। গোড়ার দিকের গোরস্থান, কোম্পানির কেরানিদের দপ্তর, ১৯২৭ সালের বেতারকেন্দ্র, ১৭১৭ সালের ঘাট। আর গল্প যেখানে ভূতের পরিচয় দিয়েছে, সে ভূত সাহেব। হয়তো এ শহর ভূত বলতে আসলে তাদেরই বোঝে, যারা এই বাড়িগুলো গড়েছিল। সাহেবদের সেই কলকাতা কবেই ফুরিয়েছে। পরের কলকাতা তাকে ছাড়েনি, গল্পে গল্পে আজও তাকে হাঁটিয়ে বেড়ায় পুরোনো বাড়িগুলোর ভেতর।
ভূতেদের সাথে সরাসরি দেখা করতে চাইলে তাঁদের গল্প পাবেন ভূতের গল্পের তাকে। শনিবার, ৭ নভেম্বর ভূত চতুর্দশী। সে রাতে বাঙালি বাড়িতে চোদ্দ প্রদীপ জ্বলে পূর্বপুরুষদের জন্য। ইতিহাসে মন থাকলে ইতিহাসের তাকে আরও হাফ প্যান্ট হিস্ট্রি রইল।
উপরের ছবিটি উইকিমিডিয়া কমন্সে CC BY-SA 4.0 লাইসেন্সে প্রকাশিত। আমাদের কেটে নেওয়া অংশটিও একই শর্তে দেওয়া হল।
তথ্যসূত্র (৬)
- List of reportedly haunted locations in India, উইকিপিডিয়া। দেখা হয়েছে ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬।
- South Park Street Cemetery, উইকিপিডিয়া। দেখা হয়েছে ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬।
- National Library of India, উইকিপিডিয়া। দেখা হয়েছে ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬।
- Writers' Building, উইকিপিডিয়া। দেখা হয়েছে ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬।
- Nimtala Crematorium, উইকিপিডিয়া। দেখা হয়েছে ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬।
- আকাশবাণী কলকাতা, বাংলা উইকিপিডিয়া। দেখা হয়েছে ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬।
ছবি: সাউথ পার্ক স্ট্রিট গোরস্থান, খোলা হয়েছিল ১৭৬৭ সালে। ২০১১ সালের মার্চের এক সকালে: Priyankardey, Wikimedia Commons, CC BY-SA 4.0, cropped
সদ্য এসেছেগল্পের চ্যানেলে নতুন কী এলসবে যা উঠেছে, বাজে চ্যানেলের নিজের ইউটিউবেই।গল্পগুলো দেখুনমুড কলকাতাকে ফলো করুন
এমন লেখা, নতুন গল্প আর গান এলেই খবর পাবেন।


