
উৎসব
কালীপুজো ২০২৬: তারিখ, অমাবস্যার সময়, আর কলকাতার নামী কালীপুজো
এ বছর কালীপুজো রবিবার, ৮ নভেম্বর ২০২৬, পুজো মাঝরাতে। দুই পঞ্জিকা মিলিয়ে অমাবস্যার সময়, দীপাবলির রাতে বাংলা কেন কালীর পুজো করে, আর কলকাতা সে রাতে কোথায় যায়।
এই লেখায় (৬)
রবিবার, ৮ নভেম্বর। সন্ধে নামলে দেশের বেশির ভাগ ঘরে লক্ষ্মীর প্রদীপ জ্বলবে, তারপর খাওয়াদাওয়া সেরে সবাই শুয়ে পড়বে। বাংলার ঘুম তখনও দূরে। পাড়ার মণ্ডপে পুরুতমশাই আসল পুজোয় বসবেন রাত গভীর হলে। ততক্ষণে গলিতে বারুদ আর ঘিয়ের গন্ধ মিশে গেছে। কারও বাড়ির ছাদের স্পিকারে সন্ধে থেকে ঘুরেফিরে বাজছে একই শ্যামাসংগীত।
একই অমাবস্যা, একই প্রদীপ, শুধু দেবী আলাদা। তফাতটা অবশ্য আমরা অনেকে যতটা পুরোনো ভাবি, ততটা নয়। তারিখের পিছনের আসল গল্পটা ওখানেই।
কালীপুজো ২০২৬ কবে?
এ বছর কালীপুজো রবিবার, ৮ নভেম্বর ২০২৬। কলকাতার হিসেবে দুটো পঞ্জিকাই দিন নিয়ে একমত। দৃকপঞ্জিকার কালীপুজোর পাতায় কলকাতায় অমাবস্যা লাগছে রবিবার বেলা ১১টা ২৭ মিনিটে, ছাড়ছে সোমবার, ৯ নভেম্বর দুপুর ১২টা ৩১ মিনিটে। বিশুদ্ধ সিদ্ধান্ত পঞ্জিকা বাংলায় ছাপা বই হয়েও বিক্রি হয়। তার মতে অমাবস্যা লাগছে ১১টা ২৯-এ, ছাড়ছে ১২টা ৩২-এ, এক-দু মিনিট পরে। এক-দু মিনিটের এই তফাতে রাত বদলায় না।
| দিন | কী | তিথি, দৃকপঞ্জিকা মতে |
|---|---|---|
| শনিবার, ৭ নভেম্বর | ভূত চতুর্দশী: দুপুরে চোদ্দ শাক, সন্ধেয় চোদ্দ প্রদীপ | চতুর্দশী লাগছে বেলা ১০টা ৪৭-এ |
| রবিবার, ৮ নভেম্বর | কালীপুজো, দীপাবলি। অন্য রাজ্যে দিওয়ালি আর লক্ষ্মীপুজো | অমাবস্যা লাগছে বেলা ১১টা ২৭-এ |
| সোমবার, ৯ নভেম্বর | দুপুর ১২টা ৩১-এ অমাবস্যা ছাড়ছে, তারপর প্রতিপদ | অমাবস্যা দুপুর ১২টা ৩১ পর্যন্ত |
| বুধবার, ১১ নভেম্বর | ভাইফোঁটা | দ্বিতীয়া মঙ্গলবার দুপুর ২টো থেকে বুধবার বিকেল ৩টে ৫৩ পর্যন্ত |
পুজো কেন মাঝরাতে
তিথি ক্যালেন্ডারের তারিখ ধরে আসে না। কোনও তিথি সকালে লেগে পরদিন দুপুরে ছাড়তে পারে, তাই কোন পার্বণ কোন দিনে পড়বে, তার আলাদা নিয়ম আছে। দুর্গার নবমী ঠিক হয় সূর্যোদয়ের তিথি দেখে। কালীপুজোর দিন ঠিক হয় মাঝরাত দেখে। বিশুদ্ধ সিদ্ধান্ত পঞ্জিকা স্পষ্ট লিখছে, এই তারিখ নিশীথকালের নিয়মে বাঁধা, মানে গভীর রাতে অমাবস্যা থাকতে হবে। এ বছর রবিবার রাতে অমাবস্যা দিব্যি থাকছে, হাতে সময়ও অনেক।
দৃকপঞ্জিকা নিশীথকালকে বেঁধেছে ৫১ মিনিটে, রাত ১০টা ৫৫ থেকে ১১টা ৪৬। বাড়ির পুজো অনেক সময় ঠিক ওই সময়টুকুই মানে। বড় বারোয়ারিতে রাস্তা অবধি লাইন পড়ে, দর্শনার্থীরা সারারাত আসতেই থাকেন। ঠিক মুহূর্তটায় থাকতে চাইলে পুজো কমিটিকে জিজ্ঞেস করে নিন ঠাকুরমশাই ক’টায় বসবেন।
কলকাতার নিশীথ পুজো আপনার শহরে ক’টায়
- কলকাতা, গোটা ভারতরবি২২:৫৫৮ নভে
- ঢাকারবি২৩:২৫৮ নভে
- লন্ডনরবি১৭:২৫৮ নভে
- নিউ ইয়র্ক, টরন্টোরবি১২:২৫৮ নভে
- সান ফ্রান্সিসকোরবি০৯:২৫৮ নভে
- দুবাইরবি২১:২৫৮ নভে
- সিঙ্গাপুরসোম০১:২৫৯ নভে
- সিডনিসোম০৪:২৫৯ নভে
রবিবার, ৮ নভেম্বর রাত ১০টা ৫৫, ভারতীয় সময়, দৃকপঞ্জিকার কলকাতার হিসেবে। ব্রিটেন আর আমেরিকার ঘড়ি ততদিনে শীতের সময়ে ফিরে গেছে।
রাতটা আগে ছিল লক্ষ্মীর
এইখানে অনেকে অবাক হন। ষোড়শ শতকে নবদ্বীপের স্মার্ত পণ্ডিত রঘুনন্দন দীপান্বিতা অমাবস্যায় লক্ষ্মীপুজোর বিধান দিয়েছিলেন, কালীর নামও করেননি। বাংলার নব্যস্মৃতির স্রষ্টা তিনিই। বাংলা উইকিপিডিয়া কালীপুজোর ইতিহাসে সে কথা লিখেছে, সাথে ১৭৬৮ সালের একটি বইয়ের কথাও, কাশীনাথের ‘কালী সপর্যাসবিধি’। এই রাতে কালীপুজোর পক্ষে বইটা জোর গলায় যুক্তি সাজিয়েছে। শশীভূষণ দাশগুপ্ত সেই যুক্তি পড়েছিলেন উল্টো দিক থেকে। যে প্রথা সবাই মানে, তার হয়ে কেউ এত তর্ক করে না।
অর্থাৎ বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণের মধ্যে আমাদের চেনা কালীপুজো নেহাতই নবীন। বাংলা উইকিপিডিয়ায় লেখা প্রচলিত মত অনুযায়ী সপ্তদশ শতকে নবদ্বীপের তান্ত্রিক কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশ প্রথম নিজে কালীমূর্তি গড়ে পুজো করেন। তাঁর আগে উপাসকেরা তামার পাতে দেবীর যন্ত্র এঁকে বা খোদাই করে পুজো করতেন। আঠারো শতকে নদিয়ার রাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায় পুজোটাকে ছড়িয়ে দেন নিজের রাজ্যে। উনিশ শতকে দক্ষিণেশ্বরে শ্রীরামকৃষ্ণ, আর শহরের ধনী পরিবারের টাকায় বছর বছর আরও বড় পুজো, এই দুয়ে মিলে কালীপুজো আজকের চেহারা পায়। ইংরেজি উইকিপিডিয়ার পাতাও আঠারো আর উনিশ শতকের কথাটা এভাবেই বলে।
পুরোনো রাতটা কিন্তু হারিয়ে যায়নি। উইকিপিডিয়া লিখছে, কালীঘাটে এই দিন কালীর পুজো হয় লক্ষ্মীরূপে। ছোট্ট একটা তথ্য। অথচ শহরের কোনও ইতিহাস বই এর চেয়ে সৎ কথা বলে না। নতুন দেবী পুরোনো দেবীর রাত নিলেন, আর পুরোনো মন্দির জায়গা রাখল দুজনেরই।
গান এসেছিল হিসেবের খাতা থেকে
বাংলার প্রতিটি কালীপুজোর রাত আসলে একজন কবিরও রাত। রামপ্রসাদ সেন জন্মেছিলেন ১৭১৮ বা ১৭২৩ নাগাদ, থাকতেন কলকাতা থেকে গঙ্গা ধরে উজানে, হালিশহরে। সবাই যে গল্পটা বলে: কলকাতার এক বাড়িতে সেরেস্তার কাজ করতেন, আর হিসেবের খাতা ভরিয়ে ফেলতেন কালীর গানে। মনিব তাঁকে তাড়িয়ে না দিয়ে মাসোহারা দিয়ে বাড়ি পাঠিয়ে দেন। উইকিপিডিয়া একে প্রচলিত কাহিনি বলেছে, আমরাও তাই বলছি। পরের কথাটার প্রমাণ অনেক পোক্ত: নদিয়ার কৃষ্ণচন্দ্র তাঁকে সভাকবি করেন, উপাধি দেন ‘কবিরঞ্জন’।
রামপ্রসাদ রেখে গেছেন গোটা ধারাটার সুর। কালীর সাথে তিনি কথা বলতেন ছেলের মতো। মা অনেকক্ষণ বসিয়ে রেখেছেন, ছেলে তাই ডাকছে আধখানা আদরে, আধখানা অভিমানে। গত শতকে যে বাঙালি বাড়িতে একটা রেডিও ছিল, সেখানেই রামপ্রসাদ পৌঁছে গেছেন পান্নালাল ভট্টাচার্য, তাঁর দাদা ধনঞ্জয় ভট্টাচার্যের মতো শ্যামাসংগীতের শিল্পীদের গলায়। মণ্ডপের আলো জ্বলে ওঠার সময় আমরা এই রেকর্ডিংগুলোই চালাতে বলব।
৫:২৮মন রে কৃষিকাজ
Atlantis Music
অ্যাটলান্টিস মিউজিক লেখক হিসেবে রামপ্রসাদের নামই দিয়েছে, গাইছে দোহার। মন এক পতিত জমি, আবাদ হল না। চাষির গান, কঠিন গান। সাড়ে পাঁচ মিনিট।
৪:৫৯থাকতে দিস রে মা
Keshab Dey
কেশব দে-র রেকর্ডিং। আমাদের সংগ্রহে সবচেয়ে বেশি শোনা শ্যামাসংগীত, সেপ্টেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত ইউটিউবে চলেছে ৪ কোটি ৩০ লক্ষের বেশি বার। পাঁচ মিনিট, তাড়াহুড়ো নেই গলায়।
৫:৪০একবার নাচো মা
DOHAR FOLK
আবার দোহার, গানের গায়ে কালিকাপ্রসাদ ভট্টাচার্যের নাম। তালবাদ্য আর লোকগানের কোরাসে জমে ওঠা গান, ভিড়ে ঠাসা গলিতে এটাই চালান। সাড়ে পাঁচ মিনিট।
৫:৩৮ভেবে দেখ মন
Aalo | আলো 🪔
আলো-র হয়ে গেয়েছেন অরিজিৎ চক্রবর্তী। শান্ত গান, পুজোর মুডের পাশাপাশি আমাদের ভোরের মুডেও রাখা। কখন চালাবেন বুঝতেই পারছেন: রাত গড়িয়ে, ভিড় পাতলা হলে।
কলকাতার নামী কালীপুজো, সংক্ষেপে
এ বছরের কমিটিগুলোর ঘোষণা এখনও বেরোয়নি, তাই এটা ছোট তালিকা: দুটো মন্দির, দুটো মণ্ডপের শহর।
কালীঘাট
দক্ষিণ কলকাতা
দুই মন্দিরের মধ্যে পুরোনো এটিই, আর এখানেই এই রাতে কালীর পুজো হয় লক্ষ্মীরূপে। পনেরো শতকের ‘মনসার ভাসান’-এ কালীঘাটের নাম আছে। উইকিপিডিয়ার হিসেবে আজ যে মন্দিরের সামনে লাইন দেন, সেটা সাবর্ণ রায়চৌধুরী পরিবারের উদ্যোগে শেষ হয় ১৮০৯ সালে। উইকিপিডিয়া লিখছে, এই দিন হাজার হাজার ভক্ত কালীঘাটে ভিড় করেন, তাই লম্বা লাইনের জন্য তৈরি থাকুন।
- কাছের মেট্রো
- কালীঘাট, ব্লু লাইন
- সে রাতে
- সন্ধে থেকে লাইন। হয় আগে যান, নয় মাঝরাতের পরে
দক্ষিণেশ্বর
শহরের উত্তরে, গঙ্গার ধারে
রানি রাসমণির মন্দির, তৈরি ১৮৪৭ থেকে ১৮৫৫-র মধ্যে। ১৮৫৬ থেকে এ মন্দিরের পূজারি ছিলেন শ্রীরামকৃষ্ণ। দেবী এখানে ভবতারিণী। চাতালের এক কোণে, গঙ্গার দিকে মুখ করে, শ্রীরামকৃষ্ণের ঘরটি আজও আছে।
- কাছের মেট্রো
- দক্ষিণেশ্বর, ব্লু লাইন
- তৈরি
- ১৮৪৭ থেকে ১৮৫৫, রানি রাসমণির উদ্যোগে
বারাসত আর নৈহাটি
উত্তর ২৪ পরগনা
মণ্ডপের শহর। উইকিপিডিয়া বারাসতের কালীপুজোকে পশ্চিমবঙ্গের সবচেয়ে বড় বলেছে। কে এক নম্বর, সে বিচার শহরগুলোই করুক। উইকিপিডিয়া কালীপুজোর যে শহরগুলোর নাম করেছে, নৈহাটি তাদের একটা। দুটোই কলকাতা থেকে ট্রেনে খানিক পথ।
- কলকাতা থেকে
- শিয়ালদা থেকে বারাসত বা নৈহাটির লোকাল ট্রেন
- সে রাতে
- ফেরার শেষ ট্রেনে ভিড় হয়। বেরোনোর আগে সময়টা দেখে নিন
বাড়িতে থাকলে
বেঙ্গালুরু বা বার্মিংহামের বাঙালির কাছে এই পুজো মানে একটা ভিডিও কল আর জানলায় একটা প্রদীপ। মির্চি বাংলার ‘টাইমস অফ পুরাণ’ ছোট ছোট পর্বে দেবীর নিজের গল্প বলে। শুরু করুন কালীর উৎপত্তি দিয়ে, তারপর রানি রাসমণির পর্ব।
১২:৪৪শুনুন: মা কালীর উৎপত্তিমা কালীর উৎপত্তি
Mirchi Bangla
টাইমস অফ পুরাণের ‘কালী কথা’ থেকে, কালীর জন্মের গল্প। তেরো মিনিট।
১৭:৪৪শুনুন: রানি রাসমণির ভক্তিরানি রাসমণির ভক্তি
Mirchi Bangla
রানি রাসমণির ভক্তির গল্প, একই সিরিজ থেকে। আঠারো মিনিট।
গোটা সিরিজটা শুনতে চাইলে শুরু করুন প্রথম পর্ব থেকে। এমন আরও গল্প আছে পুরাণের তাকে। তারপর স্পিকারের আওয়াজ বাড়িয়ে পুজোর মুড চলতে দিন, যতক্ষণ না কেউ এসে কমাতে বলে।
তথ্যসূত্র (৯)
- Bengal Kali Puja 2026, Kolkata, দৃকপঞ্জিকা। দেখা হয়েছে ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬।
- Diwali Puja Calendar 2026, Kolkata, দৃকপঞ্জিকা। দেখা হয়েছে ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬।
- Kali Chaudas 2026, Kolkata, দৃকপঞ্জিকা। দেখা হয়েছে ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬।
- Bhai Dooj 2026, Kolkata, দৃকপঞ্জিকা। দেখা হয়েছে ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬।
- Kali Puja, উইকিপিডিয়া। দেখা হয়েছে ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬।
- কালীপূজা, বাংলা উইকিপিডিয়া। দেখা হয়েছে ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬।
- Ramprasad Sen, উইকিপিডিয়া। দেখা হয়েছে ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬।
- Dakshineswar Kali Temple, উইকিপিডিয়া। দেখা হয়েছে ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬।
- Kalighat Kali Temple, উইকিপিডিয়া। দেখা হয়েছে ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬।
ছবি: পশ্চিমবঙ্গের আমাদপুরের কালী, সাদা শোলার সাজে। কালীপুজোয় দেবীর পুজো হয় মাঝরাতে, ভোরে নয়: Ratul Pal, Unsplash
সদ্য এসেছেগল্পের চ্যানেলে নতুন কী এলসবে যা উঠেছে, বাজে চ্যানেলের নিজের ইউটিউবেই।গল্পগুলো দেখুনমুড কলকাতাকে ফলো করুন
এমন লেখা, নতুন গল্প আর গান এলেই খবর পাবেন।


