
উৎসব
সিঁদুর খেলা আর বিজয়া দশমী ২০২৬: বরণ, খেলা, আর তার পরের সন্ধে
সিঁদুর খেলা এ বছর বুধবার, ২১ অক্টোবর। বরণে কী হয়, সিঁদুর নিয়ে কী বিশ্বাস, কারা খেলতে পারেন আর তা নিয়ে তর্ক কেন, আর বাঙালির দশমী শেষ হয় কীভাবে।
এই লেখায় (৬)
দশমীর দিন একবার দেবীর মুখের দিকে তাকান। সিঁথিতে পুরু সিঁদুর, কপালে লাল ছোপ, আর ঠোঁটে, যেখানে সারা বছর কেউ হাত দেয় না, একটা মিষ্টি। সবে আরতি সেরে কোনও এক মহিলা ছুঁইয়ে দিয়ে গিয়েছেন। ওপরের ছবিটা ২০১৮-র বিজয়া দশমীর, দিল্লির এক পুজোয় তোলা। অথচ সেদিন যে কোনও বাঙালি পুজোয় তোলা হতে পারত, আর ঠিক সেই কারণেই বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকা শক্ত।
বাঙালির বিশ্বাসে, বাংলা উইকিপিডিয়াও যেমন লিখেছে, পুজো মানে হিমালয়ে বাপের বাড়িতে দুর্গার ফেরা। দশমী সেই ফিরে যাওয়ার দিন। পাড়ার মেয়ে-বউরা তাঁকে বিদায় দেন ঠিক যেভাবে ঘরের মেয়েকে শ্বশুরবাড়ি পাঠান: সাজিয়ে, খাইয়ে, মুখে মিষ্টি আর সিঁথিতে সিঁদুর দিয়ে। বিদায় মিটলে ওঁরা নিজেদের মধ্যে যা করেন, তারই নাম সিঁদুর খেলা।
সিঁদুর খেলা ২০২৬ কবে?
এ বছর সিঁদুর খেলা বিজয়া দশমীতে, বুধবার, ২১ অক্টোবর। দৃকপঞ্চাঙ্গের কলকাতার পঞ্জিকায় সিঁদুর খেলা আর বাংলার দুর্গা বিসর্জন, দুটোই ওই দিনে। তিথির হিসেব ওদের বাংলার বিসর্জনের পাতায়: দশমী লাগছে মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর দুপুর ১২টা ৫০ মিনিটে, ছাড়ছে বুধবার, ২১ অক্টোবর দুপুর ২টো ১১ মিনিটে। উত্তর ভারত অবশ্য বিসর্জন সারে এক দিন আগে, মঙ্গলবারই, সে কথাও ওই পাতাতেই আছে।
কাজের কথাটা এই। দশমীর পুজো বুধবার তিথি থাকতে থাকতেই, তাই অনেক পুজোয় বরণ হয়ে যায় সকালে বা দুপুরে। দৃকপঞ্চাঙ্গ অবশ্য সিঁদুর খেলার কথা লিখেছে সন্ধেয়। দুটোই চলে। আপনার পাড়ায় কোনটা, ঠিক করবেন পুরোহিতমশাই। দিনের বাকিটা জুড়ে চলে বিসর্জন।
বরণে কী হয়
ইংরেজি আর বাংলা উইকিপিডিয়ার বিবরণে ক্রমটা এক, আর বেশির ভাগ মণ্ডপে ঠিক এই ক্রমেই দেখবেন।
- দিনের পুজো শেষ হয় বিসর্জনের পুজোয়, মানে বিদায়ের আচারে।
- বিবাহিত মহিলারা, রীতি মেনে লালপাড় সাদা শাড়িতে, একে একে বরণডালা হাতে এসে দেবীকে আরতি করেন।
- প্রত্যেকে দেবীর কপালে আর পায়ে সিঁদুর ছোঁয়ান, মিষ্টি আর পান দেন। মিষ্টিটা প্রায়ই ঠোঁটে ছুঁইয়ে দেন।
- তারপর এ ওর কপালে সিঁদুর দেন, ছোঁয়ান শাঁখা, পলা আর নোয়াতেও।
- এরপর মুখে-গালে, আর তখনই আচারটা খেলা হয়ে যায়। নামটা সেখান থেকেই।
- সবশেষে এ ওকে প্রসাদের মিষ্টি দেন।
আমাদের কাছে অবশ্য আসল মুহূর্তটা সিঁদুরের নয়, তার ঠিক আগের। বরণডালা হাতে একজন মহিলা দেবীর মুখোমুখি, এত কাছে যে চোখ আঁকার তুলির টানও দেখা যায়। আর তিনি জানেন, এ বছরের মতো এই শেষ দেখা।
সিঁদুর নিয়ে কী বিশ্বাস
বিশ্বাসটা সোজা, দুই উইকিপিডিয়াতেই তা লেখা আছে: যথাযথ রীতি মেনে সিঁদুর খেললে কোনও মহিলা কখনও বিধবা হন না। সিঁদুর মাখাতে মাখাতে ওঁরা পরস্পরের দীর্ঘ, সুখী বিবাহিত জীবন চান। সংসারের খিটিমিটি আর পাড়ার ছোটখাটো মন-কষাকষিও মিটে যায় এই লাল মাখামাখিতে, একই বিবরণে সে কথাও আছে। বয়স কত, সেটা কেউ জানে না। একটা মতে বছর দুশো, জন্ম জমিদারবাড়ির পুজোয়, বাড়ির বউদের কাছাকাছি আনার জন্য। অন্য মতে, পুজো যত পুরোনো, এই খেলাও তত, মানে বছর চারশো।
কারা খেলেন, আর তা নিয়ে তর্ক
রীতি অনুযায়ী অবিবাহিত মহিলা আর বিধবারা বাদ। ২০১৭ সালে একটি প্রচার পুজোগুলোর কাছে আর্জি জানায়, বিধবা, অবিবাহিত মহিলা, রূপান্তরকামী মহিলা আর যৌনকর্মীদের জন্যও বরণের থালা খুলে দেওয়া হোক। ওঁদের যুক্তি, সিঁদুর খেলা বিয়ের আশীর্বাদ নয়, সব মেয়ের মধ্যে একটা বাঁধন। কোনও কোনও পুজো থালা খুলে দিয়েছে, অন্যরা দেয়নি। লেখক তসলিমা নাসরিন রীতিটাকেই পিতৃতান্ত্রিক বলে সমালোচনা করেছেন। তাঁর আপত্তি দেবী আর মেয়েদের বিবাহিত পরিচয়ের ওপর এত জোর দেওয়া নিয়ে। অন্য সমালোচকদের মত, এ দেখে বড় হওয়া মেয়েরা শেখে, বিয়ে ছাড়া জীবন অসম্পূর্ণ।
আমাদের মত, তর্কটা চলুক। উত্তরটা কিন্তু বরণের মধ্যেই আছে। খেলার আগে যা হয়, মুখে মিষ্টি দিয়ে মেয়েকে বাপের বাড়ি থেকে বিদায়, সেটা শুধু সধবার জিনিস নয়। কাউকে কোনও দিন বিদায় দিয়েছেন যিনি, ওই মুহূর্ত তাঁরও। আপনার পাড়ার পুজো যদি থালাটা সব মহিলার জন্য খুলে দিয়ে থাকে, তবে গিয়ে দাঁড়ান ঠাকুরের সামনে।
নদীর ঘাটের পরে: বাঙালির দশমী যেভাবে শেষ হয়
এর পরে কী হয়, তার সবচেয়ে ভালো বিবরণটা দেড়শো বছরেরও বেশি পুরোনো। ১৮৬০-এর দশকের গোড়ায় কালীপ্রসন্ন সিংহ ‘হুতোম’ ছদ্মনামে কলকাতার এক দশমী গোড়া থেকে শেষ পর্যন্ত লিখে রেখেছিলেন। বিসর্জনের আগে দেবীর ভোগ দইকড়মা, আরতির পরেই বেজে ওঠে বিসর্জনের বাজনা, আর প্রতিমা জলে পড়লে নীলকণ্ঠ পাখি আর শঙ্খচিল উড়িয়ে ঘট নিয়ে সবাই বাড়ি ফেরে। বাড়িতে শান্তিজল, তারপর সবার সঙ্গে সবার কোলাকুলি, কলাপাতায় দুর্গানাম লেখা। তারপর সেদিনের শহর নিয়ে তাঁর সেই লাইন, যার চেয়ে ভালো কথা আজও কেউ লেখেননি: ‘ক দিন মহাসমারোহের পর আজ সহরটা খাঁ খাঁ কর্ত্তে লাগ্লো’।
তার অনেকটাই আজও আছে। বড়দের প্রণাম, কোলাকুলি, মিষ্টি, বাড়ি বাড়ি ঘোরা আর ফোনের পালা, বাঙালি যাকে এক কথায় বিজয়া বলে, তাতেই ভরে থাকে পরের দিনগুলো। পুরোনো পারিবারিক পুজোগুলোয় তার দেখা মেলে। সেগুলো কোথায় কোথায়, পাবেন আমাদের উত্তর কলকাতার বনেদি বাড়ির পুজোর লেখায়। আর চার দিন পরে, কোজাগরী লক্ষ্মীপুজোয়, ঘরে আবার ফেরেন দেবীর মেয়ে।
দশমীর সন্ধের গান
২:২৫বিসর্জন
Zee Music Bangla
‘সাঁঝবাতি’ ছবির গান, জি মিউজিক বাংলা, ২০১৯, নাম আছে শান আর অনুপম রায়ের। আড়াই মিনিট, আর এই দিনের জন্য আমাদের সংগ্রহে সবচেয়ে মন-খারাপ করা ছোট গান।
৩:০৬ঢাকে কাঠি বিসর্জনের
90s Kid Prime
বিসর্জনের ঢাকের গান, গেয়েছেন সানন্দা আর ত্রিশা। তিন মিনিটের গান, ৯০স কিড প্রাইম-এর ২০২৩-এর এক পুজোর সংকলন থেকে।
১০:১০দশমী, পুজোর ঢাক
Saregama Bengali
সারেগামার দশ মিনিটের দশমীর ঢাক, ফণী নট্ট, জয়দেব নন্দী, মণীন্দ্র দাস আর ব্রজকান্ত নন্দীর। ঘাটে যাওয়ার পথে, কিংবা যেতে না পারলে বারান্দায়। অষ্টমীরটা আছে আমাদের ধুনুচি নাচের লেখায়।
৩:০৯জাগো উমা
SVF
সৃজিত মুখোপাধ্যায়ের ছবি ‘উমা’-র গান, এসভিএফ, ২০১৮, নাম আছে রূপঙ্কর আর অনুপম রায়ের। যে সন্ধেয় উমা চলে গিয়েছেন, সেই সন্ধের জন্য উমার গান।
ঢাক থামলে পুজোর মুডে মরসুমের গান চলতেই থাকবে, আর শহর যে সন্ধেয় খাঁ খাঁ করে, তার জন্য নরম গানগুলো আছে রবীন্দ্রসঙ্গীতের মুডে। গোটা সপ্তাহের হিসেব, দিন ধরে ধরে, রইল আমাদের দুর্গাপুজো ২০২৬-এর লেখায়।
তথ্যসূত্র (৬)
- সিঁদুর খেলা (Sindur Khela), উইকিপিডিয়া (ইংরেজি)। দেখা হয়েছে ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬।
- সিঁদুর খেলা, বাংলা উইকিপিডিয়া। দেখা হয়েছে ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬।
- দুর্গাপূজা, বাংলা উইকিপিডিয়া। দেখা হয়েছে ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬।
- হুতোম প্যাঁচার নক্সা: দুর্গোৎসব, বাংলা উইকিসংকলন। দেখা হয়েছে ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬।
- বাংলার দুর্গা বিসর্জন ২০২৬, কলকাতা, দৃকপঞ্চাঙ্গ। দেখা হয়েছে ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬।
- সিঁদুর উৎসব ২০২৬, কলকাতা, দৃকপঞ্চাঙ্গ। দেখা হয়েছে ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬।
ছবি: বিজয়া দশমীর বরণের পর দেবী, ১৯ অক্টোবর ২০১৮: সিঁথিতে সিঁদুর, ঠোঁটে মিষ্টি।: Ramesh Lalwani, Wikimedia Commons, CC BY 2.0, cropped
সদ্য এসেছেগল্পের চ্যানেলে নতুন কী এলসবে যা উঠেছে, বাজে চ্যানেলের নিজের ইউটিউবেই।গল্পগুলো দেখুনমুড কলকাতাকে ফলো করুন
এমন লেখা, নতুন গল্প আর গান এলেই খবর পাবেন।


