উৎসব
ধুনুচি নাচ: কখন হয়, ধুনুচিতে কী জ্বলে, আর কোন ঢাকে নাচবেন
মাটির ধুনুচিতে কী জ্বলে, পুজোর কোন সময়ে নাচ হয়, নাচটা আসলে কাদের। আর ২০২৬-এর পুজোয় বাড়িতে বসেই নাচতে চাইলে ঢাকের দুটো রেকর্ডিং, সঙ্গে ঢাকের তালে বাঁধা তিনটে গান।
এই লেখায় (৬)
২০১৬ সালে বাঁকুড়ায় মাঝারি মাপের একটা মাটির ধুনুচির খুচরো দাম ছিল ২০ থেকে ২৫ টাকা। অন্তত বাংলা উইকিপিডিয়ার ধুনুচির পাতা তাই বলছে। মণ্ডপে এর চেয়ে সস্তা জিনিস কমই আছে। অথচ সন্ধের আরতিতে ঢাকে কাঠি পড়ল, কেউ দু’হাতে দুটো ধুনুচি তুলে নিলেন, আর গোটা মণ্ডপ ঘুরে তাকাল ওই দিকেই।
ধুনুচি নাচ কী, আর কোথাকার?
ধুনুচি নাচ মানে ঠাকুরের সামনে ঢাকের তালে ধুনুচি হাতে নাচ। খাতায়-কলমে নাম ধুনুচি নৃত্য। বাংলা উইকিপিডিয়ার হিসেবে এটা পশ্চিমবঙ্গ আর বাংলাদেশের বাঙালি হিন্দুদের ঐতিহ্য। কোন রাজ্যের নাচ? পশ্চিমবঙ্গের। আর সীমান্ত পেরিয়ে, বাংলাদেশের।
নামটা সোজা বাংলা। ধুনো জ্বলে যে পাত্রে, সেটা ধুনুচি। সেই ধুনুচি হাতে নাচ, ধুনুচি নাচ। ইংরেজি উইকিপিডিয়া একে বলে ধূপদানি হাতে নাচ। কথাটা ঠিক, শুনতে যদিও একেবারে অন্যরকম।
ধুনুচিতে কী জ্বলে
ধুনুচি দেখতে মুখ-ছড়ানো একটা মাটির পাত্র, নীচে ধরার সরু ডাঁটি। কোনওটায় একটা হাতল, কোনওটায় দুটো, কোনওটায় একটাও নয়। ভেতরে শুকনো নারকেলের ছোবড়া ধিকিধিকি জ্বলে, ওপরে পড়ে ধুনো। বাংলা উইকিপিডিয়া তার সঙ্গে আরও দুটো কথা জুড়েছে। ধুনোর সঙ্গে কর্পূরও পড়ে। আর কেউ কেউ ছোবড়া ধরাতে নীচে এক পরত জ্বলন্ত কয়লাও বিছিয়ে দেন। ইংরেজি উইকিপিডিয়ার বর্ণনা অবশ্য কয়লা দিয়েই শুরু। যত ধুনো পড়ে, তত ধোঁয়া।
পুজোর আগে প্রতি বছর নদিয়া, বাঁকুড়ার মতো জেলার কুমোররা গাদা গাদা ধুনুচি গড়েন। পিতল বা রুপোর ধুনুচিও হয়। সেগুলোর হাতল লম্বা, নইলে ধাতুর গরম সোজা হাতে এসে লাগে।
কখন নাচ হয়?
ধুনুচি নাচ হয় মূলত আরতির সময়। পুরোহিত একে একে আলো, ধূপ-ধুনো আর অন্য উপচার দিয়ে ঠাকুরকে আরতি করেন। ইংরেজি উইকিপিডিয়ার ধুনুচির পাতা বলছে, ধুনুচি প্রায়ই আসে প্রদীপের পরে। সে প্রদীপে সলতে থাকে বেজোড় সংখ্যায়। বাংলাদেশের পুজোর কথায় বাংলা উইকিপিডিয়া লিখছে, পুজোর প্রতিদিন সন্ধের আরতিতে ভক্তরা ধুনুচি হাতে ঠাকুরের সামনে নাচেন। তবে নাচ শুধু আরতিতে বাঁধা নয়। দুর্গাপুজো নিয়ে ইংরেজি উইকিপিডিয়ার লেখায় আছে, ঢাকের তালে লোকে নাচেন আরতির সময়ে, আবার তার বাইরেও।
কোন কোন দিন? ইংরেজি উইকিপিডিয়ার ধুনুচি নৃত্যের পাতার মতে, নাচটা হয় মূলত পুজোর শেষ ক’দিনে, অষ্টমী থেকে দশমীর মধ্যে। কলকাতার হিসেবে এ বছর অষ্টমী পড়েছে সোমবার, ১৯ অক্টোবর। নবমী মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর। দশমী বুধবার, ২১ অক্টোবর। পাড়ার পুজো গুপ্তপ্রেস বা বেণীমাধব শীলের পঞ্জিকা মানলে অষ্টমী এক দিন আগে, রবিবার, ১৮ অক্টোবর। নবমী আর দশমী নিয়ে এই মতের পুজোগুলোও সবাই একমত নয়। পুজোর বাকি দিনের সময়সূচি পাবেন আমাদের দুর্গাপুজো ২০২৬-এর দিন ধরে ধরে লেখায়।
বাংলাদেশের দুর্গাপুজো নিয়ে লেখা বাংলা উইকিপিডিয়ার পাতাটি সন্ধিপুজোর নাম করেই বলেছে: ধুনুচি নাচ বিশেষ করে হয় তখনই। অন্য পাতাগুলোয় সন্ধিপুজোর আলাদা উল্লেখ নেই। কলকাতায় ব্যাপারটা পাড়াভেদে বদলায়।
কারা নাচেন: ছেলেরা, মেয়েরা, না দু’দলই?
আড্ডায় এ প্রশ্ন তুললে তর্ক বাধবেই। ইংরেজি উইকিপিডিয়ার মতে, প্রথা অনুযায়ী ধুনুচি নাচ মেয়েদের। বাংলা উইকিপিডিয়া লিখছে ঠিক উল্টো: আগে এটা ছিল ছেলেদের নাচ, এখন মেয়েরাও দিন দিন বেশি করে নাচছেন। ইংরেজি পাতার লাইনটার পাশে কোনও সূত্র নেই। অথচ সেই পাতারই দেওয়া একটা সূত্র নাচটাকে বলছে পুরুষপ্রধান। কাগজে-কলমে তর্কটা তাই খোলাই থাকল।
তবে দুর্গাপুজো নিয়ে ইংরেজি উইকিপিডিয়া আলাদা একটা আচারের কথা লিখে রেখেছে, ‘ধুনো পোড়া’। কিছু জায়গায়, বিশেষ করে বাড়ির পুজোয়, এয়োস্ত্রীরা মাথায় আর দু’হাতে কাপড় পেতে তার ওপর জ্বলন্ত ধুনুচি বসিয়ে নেন। ধুনুচিতে জ্বলে ধুনো আর শুকনো নারকেল। আজকের পাড়ার পুজোয় অবশ্য শেষ কথা কমিটির। তাই ধুনুচি তোলার আগে একবার জিজ্ঞেস করে নিন।
স্টেপ, আর ক’টা ধুনুচি
ধুনুচি নাচের বাঁধাধরা স্টেপ ইংরেজি বা বাংলা উইকিপিডিয়ায় কোথাও লেখা নেই। ইংরেজি উইকিপিডিয়া বরং দক্ষতা মাপে ধুনুচি গুনে। নতুনরা একটা বা দুটো নেন, পাকা নাচিয়েরা তিনটে, দু’হাতে দুটো আর তৃতীয়টা মুখে। বাংলা উইকিপিডিয়ার ধুনুচির পাতায় লেখা আছে, অনেক পুজোয় সেরা নাচের প্রতিযোগিতাও হয়। প্রথমবার যিনি নাচবেন, তাঁকে আমরা পাঁচটা কথা বলব:
- ধুনুচি ধরুন ডাঁটিতে, পাত্রে নয়। মাটি তাড়াতাড়ি তেতে ওঠে।
- শাড়ির আঁচল বা ওড়না ধুনুচির মুখ থেকে দূরে রাখুন। দোলানোর সময় ছোবড়া দপ করে জ্বলে উঠতে পারে।
- সঙ্গে একটা গামছা রাখুন। ইংরেজি উইকিপিডিয়া লিখছে, ছেলে-মেয়ে সব নাচিয়েই রাখেন। আঙুল আর কপাল, দুটোই বাঁচে।
- দাঁতে ধুনুচি ধরার কসরতটা আগে যাঁরা করেছেন, তাঁদের জন্যই তোলা থাক।
- বাড়িতে জ্বালালে বারান্দায়, নয়তো খোলা জানলার ধারে। ধুনো তো ধূপকাঠি নয়, বন্ধ ঘর সেটা টের পাইয়ে দেবে।
কোন ঢাকে নাচবেন
নাচ চলে ঢাকের তালে, ঢাক চলে আরতির সঙ্গে। ইংরেজি উইকিপিডিয়ার ঢাকের পাতা বলছে, ঢাকের বাদ্যি আর আরতি মিলিয়ে দুর্গাপুজোর এই অংশটা একান্তই বাংলার। আরতির ঢাকে কোন বোলের কী নাম, ঢাক বা ধুনুচি নাচ নিয়ে ইংরেজি-বাংলা কোনও উইকিপিডিয়া পাতায় তা নেই। মণ্ডপের ঢাকিকেই জিজ্ঞেস করুন, উনি এই বাজনাকে কী বলেন। পুজোর সপ্তাহে এর চেয়ে ভালো আলাপ কমই হবে।
ঘরেই আসর বসাতে চাইলে রইল দুটো খাঁটি ঢাকের রেকর্ডিং, আর ঢাকের তালে বাঁধা তিনটে গান। যত জমিয়ে নাচতে চান, তত ওপরের দিকেরটা বাছুন।
৫:০৫অষ্টমী, পুজোর ঢাক
Saregama Bengali
সারেগামার রেকর্ডিং, নাম আছে চার ঢাকির: ফণী নট্ট, জয়দেব নন্দী, মণীন্দ্র দাস আর ব্রজকান্ত নন্দী। পাঁচ মিনিটের ঢাক। এই পুজোয় একটাই ট্র্যাকে নাচলে এটাতেই নাচুন।
১০:১০দশমী, পুজোর ঢাক
Saregama Bengali
সেই চার ঢাকি, দশ মিনিট ধরে। দশমীর সন্ধেয় চালান, কিংবা নাচিয়ের দম লম্বা হলে।
৪:২৩ঢাক বাজা কাঁসর বাজা
T-Series
শ্রেয়া ঘোষাল, সুর জিৎ গাঙ্গুলির, ২০১৬। ঢাক আর কাঁসর এখানে পুজোর গান হয়ে গিয়েছে। সেপ্টেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত ইউটিউবে দেখা হয়েছে সাড়ে সাত কোটির বেশি বার। আমাদের সংগ্রহের ঢাকের গানে এটাই সবচেয়ে বেশি দেখা।
৪:৫২ঢাকের তালে
SVF Music
রবি কিনাগীর ২০০৯ সালের ছবি ‘পরান যায় জ্বলিয়া রে’-র গান। গেয়েছেন অভিজিৎ, পরিণীতা আর সুদীপ্ত, সুর জিৎ গাঙ্গুলির। রাত বাড়লে নাচ যখন হইহুল্লোড়ে গড়ায়, তখনকার জন্য।
৩:০৭নাচে মন ঢাকের বোলে
Zee Music Bangla
গেয়েছেন শুভশ্রী দেবনাথ আর বরেণ্য সাহা, সুর বরেণ্যর, কথা পীযূষ দাসের। ২০২৫-এর পুজোর গান, জি মিউজিক বাংলা থেকে, তিন মিনিটের একটু বেশি। কথাটা নামেই বলা আছে।
একটা ট্র্যাক শেষ হলে পুজোর মুড নিজে থেকেই এই মরসুমের আরও গান চালিয়ে যাবে। আগমনী থেকে দশমীর বিজয়া, গোটা সপ্তাহের গান পাবেন আমাদের দুর্গাপুজোর গানের লেখায়।
তথ্যসূত্র (৮)
- ধুনুচি (Dhunachi), উইকিপিডিয়া (ইংরেজি)। দেখা হয়েছে ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬।
- ধুনুচি নৃত্য (Dhunuchi Nritya), উইকিপিডিয়া (ইংরেজি)। দেখা হয়েছে ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬।
- ধুনুচি, বাংলা উইকিপিডিয়া। দেখা হয়েছে ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬।
- ধুনুচি নৃত্য, বাংলা উইকিপিডিয়া। দেখা হয়েছে ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬।
- বাংলাদেশে দুর্গাপূজা, বাংলা উইকিপিডিয়া। দেখা হয়েছে ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬।
- দুর্গাপুজো (Durga Puja), উইকিপিডিয়া (ইংরেজি)। দেখা হয়েছে ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬।
- ঢাক (Dhak), উইকিপিডিয়া (ইংরেজি)। দেখা হয়েছে ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬।
- সন্ধিপুজো ২০২৬, কলকাতা, দৃকপঞ্চাঙ্গ। দেখা হয়েছে ৮ অক্টোবর ২০২৬।
মুড কলকাতাকে ফলো করুন
এমন লেখা, নতুন গল্প আর গান এলেই খবর পাবেন।


