মূল অংশে যান
MoodKolkata
অলংকরণ: চওড়া লাল পাড়ের সাদা গরদ, লাল ব্লাউজ আর হাতে শাঁখা-পলা পরা এক বাঙালি মেয়ে, পাশে সাদা ধুতি আর ঘিয়ে রঙের সিল্কের পাঞ্জাবি, কাঁধে ভাঁজ করা চাদর নিয়ে এক পুরুষ, দুজনে দুজনের দিকে ফিরে। বাঁ দিকের কিনারে গাঁদার মালা, ডান দিকে আবছা আঁকা একটা ঢাক
অলংকরণ: মুড কলকাতা

উৎসব

পুজোর সাজ ২০২৬: ষষ্ঠী থেকে দশমী, দিনে আর রাতে কী পরবেন

ষষ্ঠী থেকে দশমী, রোজ দিনে একটা আর রাতে একটা সাজ, মেয়েদের আর ছেলেদের। কোন তাঁত, কোন রং, আর কেন। অক্টোবরের কলকাতায় পায়ে কী পরবেন, খরচই বা কত।

কোয়েল মণ্ডলপ্রকাশ হালনাগাদ

এই লেখায় (১১)

পুজোর জামা নিয়ে বাঙালির অভিমান আজকের নয়। রবীন্দ্রনাথের ‘শিশু’ বইয়ে একটা কবিতা আছে, ‘পূজার সাজ’। আশ্বিনের মাঝামাঝি বাজনা বেজে উঠতেই দুই ভাই মধু আর বিধু ছুটে যায় বাবার কাছে, কী পোশাক কেনা হল জানতে। মা বের করে দেখান, দুখানা ছিটের জামা আর একজোড়া ধুতি-চাদর। সে বছর ধান হয়নি, লোকসান গেছে অনেক। ওদিকে রায়বাবুদের গুপি পেয়েছে জরির টুপি আর ফুলকাটা সাটিনের জামা। রাগে মধু নিজের কাপড় ধুলোয় ছুড়ে ফেলে। বিধু বলে, তার এই কাপড়ই পছন্দ।

‘শিশু’ বেরিয়েছিল ১৯০৩ সালে। একশো তেইশ বছর পরেও পুজোর আলমারিতে ওই তুলনার খোঁচাটা রয়ে গেছে। এখন তার সাথে জুটেছে ফোনের ক্যামেরা, এই যা। এই লেখায় আমরা বিধুর দলে। মণ্ডপে যে পোশাক সবচেয়ে মানায়, সেটা আলমারির সবচেয়ে দামি জিনিস প্রায় কখনওই নয়। মানায় ঠিক সময়ের, ঠিক গরমের, ঠিক আচারের কাপড়।

তাই ষষ্ঠী থেকে দশমী, ছ’দিনের একটা ছক রইল। রোজ দিনে একটা, রাতে একটা সাজ, মেয়েদের আর ছেলেদের। প্রথম পছন্দ সব দিনই দেশি তাঁত আর সিল্ক। তারিখ আর আচারের সময় আমাদের দুর্গাপুজো ২০২৬-এর দিন ধরে লেখা মেনে। ওই লেখার প্রতিটি সময় দৃকপঞ্চাঙ্গের কলকাতার হিসেব মেনে দেওয়া। পাড়ার পুজো গুপ্তপ্রেস বা বেণীমাধব শীলের পঞ্জিকা মানলে সপ্তমী আর অষ্টমী এক দিন করে আগে (সপ্তমী, শনিবার, ১৭ অক্টোবর আর অষ্টমী, রবিবার, ১৮ অক্টোবর), আর সন্ধিপুজো সোমবার সকাল ৭টা ২৬ থেকে ৮টা ১৪। নবমী আর দশমী নিয়ে এই মতের পুজোগুলোও সবাই একমত নয়, তাই মণ্ডপের নোটিস দেখে নিন।

গোটা ছকটা এক টেবিলে

দুর্গাপুজো ২০২৬: রোজ দিনের আর রাতের সাজ, মেয়েদের ও ছেলেদের
দিনমেয়েদের, দিনেমেয়েদের, রাতেছেলেদের, দিনেছেলেদের, রাতে
ষষ্ঠী, শুক্র ১৬ অক্টোবরসুতির তাঁত, সরষে-হলুদ জমি, মেরুন পাড়ধনেখালি বা শান্তিপুরি, একটু গাঢ় রঙেসুতির কুর্তা বা পাঞ্জাবি, ট্রাউজার্সসুতির পাঞ্জাবি, হাতা গোটানো
শনি ১৭ অক্টোবর, ষষ্ঠীর দ্বিতীয় দিনহালকা টাঙ্গাইল, হাঁটার মতোতসর, বা গাঢ় রঙের টাঙ্গাইলখাদির কুর্তা, ট্রাউজার্সঘিয়ে কুর্তার ওপর কাঁথাস্টিচের কোটি
সপ্তমী, রবি ১৮ অক্টোবরসুতির জামদানি, সাদাটে জমি, নকশায় রংবালুচরী বা মুর্শিদাবাদ সিল্কতাঁতের সুতির পাঞ্জাবি, চুড়িদারসিল্ক বা তসরের পাঞ্জাবি
অষ্টমী, সোম ১৯ অক্টোবরলালপাড় সাদা গরদসিল্ক, বা জামদানি নকশার গরদধুতি আর ঘিয়ে পাঞ্জাবিমেরুন বা বোতল-সবুজ সিল্কের পাঞ্জাবি
নবমী, মঙ্গল ২০ অক্টোবরহালকা সুতি বা নরম তসরসোনালি সরু পাড়ের কালো তাঁত, ওপরে ছোট জ্যাকেটসবচেয়ে আরামের সুতির পাঞ্জাবিছোট কুর্তা, ধুতি-ধাঁচের প্যান্ট, হাতকাটা জ্যাকেট
দশমী, বুধ ২১ অক্টোবরলালপাড় সাদা শাড়িসেই শাড়িই, বিসর্জন পর্যন্তসাদা বা ঘিয়ে পাঞ্জাবি, থাকলে ধুতিঘাট অবধি হাঁটার মতো সুতির পাঞ্জাবি

সুটকেসে তিনটের বেশি শাড়ির জায়গা না হলে একটা সুতির তাঁত, একটা গরদ বা যে কোনও লালপাড় সাদা, আর সন্ধের জন্য একটা সিল্ক রাখুন। দুটো সুতির আর একটা সিল্কের পাঞ্জাবি, সাথে একটা ধুতি, ছেলেদের গোটা সপ্তাহ এতেই চলে যায়।

আগে আবহাওয়া: সন্ধে পর্যন্ত সুতিই কেন

ভারতের আবহাওয়া দফতরের ১৯৯১ থেকে ২০২০ সালের হিসেব বলছে, অক্টোবরে আলিপুরে দিনের তাপমাত্রা গড়ে ৩২.৩ ডিগ্রি, রাতে ২৪.৪ ডিগ্রি। আপেক্ষিক আর্দ্রতা ৭৬ শতাংশ, মাসে বৃষ্টি ১৭৯.৬ মিলিমিটার, বৃষ্টির দিন ৭.৪টি। এ হল গড়, পূর্বাভাস নয়। তবু এতেই বোঝা যায়, ভারী সিল্ক পরা মেয়েটি কেন সকাল এগারোটাতেই প্যান্ডেলের ম্যাপ দিয়ে হাওয়া খাচ্ছে। আর পলিয়েস্টারের শার্ট পরা ছেলেটির পিঠ কেন দ্বিতীয় মণ্ডপেই ভিজে সপসপে।

তাঁতের সুতি হাওয়া খেলায়, তাড়াতাড়ি শুকোয়, এক পশলা বৃষ্টিতে ভিজলেও মান যায় না। সন্ধেয় আলো জ্বলে, বাতাস কয়েক ডিগ্রি ঠান্ডা হয়, সিল্ক খোলে তখনই। হঠাৎ বৃষ্টি নামলে কাজে দেবে, তাই ব্যাগে একটা সুতির ওড়না, গামছা বা চাদর রাখুন। জল পড়লেই দাগ ধরে, এমন কাপড় এড়িয়ে চলুন। হালকা শিফনে গাঢ় ছাপ থাকলে প্রথম ফোঁটাটাই চোখে পড়ে।

ষষ্ঠী, শুক্র ১৬ আর শনি ১৭ অক্টোবর: দিনে তাঁত, প্রথম বড় রাতে কোটি

এবার ষষ্ঠী শুক্রবার। বিল্ব নিমন্ত্রণের সময় দুপুর ২টো ৫১ থেকে বিকেল ৫টা ১১। আপনার অফিস খোলা থাকলে এটাই তাঁতের দিন: শান্তিপুর বা ধনেখালির সুতির শাড়ি। ভারতের ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্যের তালিকায় পশ্চিমবঙ্গের নামে শান্তিপুরের শাড়ি উঠেছে ২০০৯-১০ সালে, ধনেখালির ২০১১-১২-য়। তাঁত অফিসের চেয়ারেও টানটান থাকে, আবার ছ’টায় বেরোলে দেখে পুজো পুজোই লাগে।

রঙের কথায় আমরা বলব, সরষে-হলুদ জমি আর মেরুন পাড়। কাঁচা হলুদ আর আলতার রং। দুপুরের রোদেও এ রং মরে না। সপ্তাহের শেষ দিকে লাল-সাদা তো পরবেনই, তার সাথেও এ রং ঝগড়া বাধায় না। ব্লাউজ সাদামাটা মেরুন, কানে ছোট দুল, পায়ে চামড়ার চটি।

অলংকরণ: সরষে-হলুদ সুতির তাঁতের শাড়ি, বোনা মেরুন পাড় আর ছোট বুটি, কনুই পর্যন্ত হাতার মেরুন ব্লাউজ, কপালে লাল টিপ, কাঁধে পাটের ব্যাগ, পায়ে বাদামি চটি পরে হেঁটে চলেছেন এক তরুণী
অলংকরণ: মুড কলকাতা

শুক্রবার রাতে ঠাকুর দেখতে বেরোলেও সুতিই ভালো: মেয়েদের একটু গাঢ় রঙের ধনেখালি বা শান্তিপুরি, ছেলেদের হাতা গোটানো সুতির পাঞ্জাবি।

শনিবার, ১৭ অক্টোবর ষষ্ঠীর দ্বিতীয় দিন, পুজোর প্রথম শনিবারও। দিনে হালকা টাঙ্গাইল, গলিতে গলিতে হাঁটার মতো। রাতে তসর। তাতে সিল্কের জেল্লা আছে, আবার সুতির খানিকটা আরামও। ছেলেরা দিনে খাদির কুর্তা পরুন। রাতে ঘিয়ে কুর্তার ওপর শুধু একটা জিনিস চাপান, হাতকাটা কোটি। চারকোল রঙের কোটিতে সাদা সুতোর কাঁথাস্টিচ থাকলে কাজ চোখে পড়ে, অথচ সং সেজেছেন বলে মনে হয় না। এ বছর ছেলেদের লুকবুক থেকে চেক শার্ট সরছে, আসছে এই রকম সুতোর কাজ। পায়ে লোফার বা চামড়ার চটি, তবে নতুন জোড়া নয়।

অলংকরণ: ঘিয়ে সুতির কুর্তা, তার ওপর সাদা কাঁথাস্টিচে পাতার নকশা তোলা চারকোল রঙের হাতকাটা কোটি, মরচে রঙের প্যান্ট, বাদামি লোফার, আড়াআড়ি কাপড়ের ব্যাগ নিয়ে হেঁটে চলেছেন এক তরুণ
অলংকরণ: মুড কলকাতা

সপ্তমী, রবি ১৮ অক্টোবর: ভোরে জামদানি, রাতে বালুচরী

সপ্তমীর আচার শুরু সূর্য ওঠার আগে। কলাবউ স্নানে যান ভোরে। কলকাতায় সূর্য উঠছে ৫টা ৩৪-এ, সপ্তমী তিথি থাকছে সকাল ৮টা ২৭ পর্যন্ত। ঢাকির পেছন পেছন ঘাটে যেতে চাইলে সিঁড়ি আর ভিড় সামলানোর মতো কিছু পরুন। যেমন পাতলা সুতির জামদানি, সাদাটে জমি, রং শুধু বোনা নকশায়। জামদানির আদি নাম ঢাকাই, ঢাকার নামে। ২০১৩ সালে ইউনেস্কো জামদানি বোনার শিল্পকে অধরা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকায় তুলেছে, বাংলাদেশের নামে। পশ্চিমবঙ্গেও তাঁতিরা এ শাড়ি বোনেন। হালকা, প্রায় স্বচ্ছ শাড়ি ভোরের আবছা আলোটুকুও ধরে রাখে। গায়েও থাকে ঠান্ডা।

অলংকরণ: সবুজে-নীল আর মরচে রঙের বোনা ফুলের নকশার পাতলা সাদাটে সুতির জামদানি, মরচে রঙের ছোট হাতার ব্লাউজ, রুপোর ঝুমকো, পাশে ফেলা বিনুনিতে সাদা ফুল আর পায়ে নকশা করা নাগরা পরে হাঁটছেন এক তরুণী
অলংকরণ: মুড কলকাতা

ছেলেদের এই সকালটা তাঁতের সুতির পাঞ্জাবির। হাঁটু পর্যন্ত, নীল জমিতে সরু ডোরা, নীচে চুড়িদার। ইচ্ছে হলে এক কাঁধে গামছা-চেকের স্কার্ফ। গামছা বাংলার নিজের কাপড়। ঘামে ভেজা মুখ মোছা যায়, ছবিতেও মানায়। এ বছরের ছেলেদের লুকবুকে কোলাপুরি ধাঁচের চটি আবার ফিরেছে। জল-কাদায় সোয়েডের জুতোর চেয়ে এ চটি ঢের বেশি টেকে।

অলংকরণ: হাঁটু পর্যন্ত সরু ডোরার নীল তাঁতের পাঞ্জাবি, কাঠের বোতাম, সাদাটে চুড়িদার, এক কাঁধে লাল-সাদা গামছা-চেকের স্কার্ফ, হাতে স্টিলের ঘড়ি আর পায়ে বাদামি চামড়ার চটি পরে দাঁড়িয়ে এক তরুণ
অলংকরণ: মুড কলকাতা

সপ্তমীর রাত বালুচরীর। আঁচল জুড়ে খোপে খোপে বোনা গল্প। এখনকার অনেক শাড়িতে সে গল্প মহাভারত আর রামায়ণের। একসময় এ শাড়ি বোনা হত মুর্শিদাবাদে, আজ আসল বালুচরী বোনা হয় শুধু বিষ্ণুপুর আর তার আশপাশে। ২০১১ থেকে এ শাড়ি জিআই-স্বীকৃত। ইংরেজ আমলে এই বুনন প্রায় মরে এসেছিল। বিশ শতকে শিল্পী শুভ ঠাকুর তাঁতি অক্ষয়কুমার দাসকে নিজের কেন্দ্রে ডেকে নেন জ্যাকার্ড বুনন শিখতে, আর বালুচরী আবার বেঁচে ওঠে। মেরুন বালুচরীর সাথে বোতল-সবুজ ব্লাউজ, পুরোনো জুটি। মণ্ডপের হলদে আলোয় দুটো রংই আরও গাঢ় হয়, ফিকে হয় না।

অলংকরণ: খোপে খোপে ছোট মানুষের নকশা আর কলকা পাড়ের গাঢ় মেরুন সিল্কের বালুচরীর আঁচল মেলে ধরেছেন এক মহিলা, গায়ে গাঢ় সবুজ সিল্কের ব্লাউজ, গলায় সোনালি চোকার, কপালে বড় লাল টিপ, পায়ে নিচু হিলের চটি
অলংকরণ: মুড কলকাতা

অষ্টমী, সোম ১৯ অক্টোবর: গরদের সকাল

অষ্টমীর সকালে সময়ের হিসেবটা কষতে হয় উল্টো দিক থেকে। অষ্টমী তিথি ছাড়ছে সোমবার সকাল ১০টা ৫১-য়, সন্ধিপুজো শুরু ১০টা ২৭-এ। তাই বেশির ভাগ মণ্ডপে অঞ্জলি সম্ভবত সন্ধিপুজোর আগেই মিটে যাবে। ন’টার মধ্যে তৈরি হয়ে মণ্ডপে পৌঁছোন। গুপ্তপ্রেস পঞ্জিকা মানা মণ্ডপে অবশ্য অঞ্জলি মিটে যাবে সোমবার মোটামুটি সকাল ৭টার মধ্যেই। জুতো খুলে রাখতে হবে বাইরে। চট করে খোলা যায়, ফিরে এসে চেনাও যায়, এমন জোড়াই পরুন।

মেয়েদের এ সকাল গরদের। গরদ খাঁটি সিল্ক, বোনা হয় মুর্শিদাবাদ আর বীরভূমে। পুজোয় বাঙালি হিন্দু মেয়েরা গরদ পরেন, বিশেষ করে দুর্গাপুজোর অষ্টমীতে আর বিসর্জনের দিনের সিঁদুর খেলায়। জিআই-স্বীকৃতি এসেছে ২০২৪ সালে। রাজ্যের তাঁত সমবায় তন্তুজর বিপণিতে অনেক গরদই লালপাড় সাদা: কোনওটায় সাদামাটা লাল পাড়, কোনওটায় ডাবল জ্যাকার্ড, কোনওটার আঁচলে নকশা। লাল আর সাদা তো এই আচারেরই রং। অষ্টমীর সকালে মণ্ডপে দাঁড়ালেই দেখবেন, একই দুটো রং প্রতিমায়, মেয়েদের শাড়িতে, ঢাকের গায়েও। আর লাল পাড়ে ফুলের দাগও ঢাকা পড়ে যায়।

অলংকরণ: অঞ্জলির জন্য খালি পায়ে দাঁড়িয়ে পেতলের থালায় গাঁদা আর সাদা ফুল হাতে এক মহিলা, পরনে ছোট লাল কলকার বুটি আর চওড়া লাল পাড়ের সাদা গরদ, লাল সিল্কের ব্লাউজ, হাতে শাঁখা-পলা, সিঁথিতে সিঁদুর, আঁচলের খুঁটে চাবির গোছা
অলংকরণ: মুড কলকাতা

এ বছর বিপণির তাকে দেখা যাচ্ছে, গরদ মিশছে অন্য বুননে। ৩০ সেপ্টেম্বর তন্তুজর নিজের বিপণিতে ছিল জামদানি নকশার সরষে-হলুদ গরদ, সাদা আর মরচে-কমলা গরদ কোরিয়াল, আর সাদা আর চারকোল রঙের গরদ বালুচরী। কোরিয়াল গরদেরই বোন, ২০২৪ সালে সে-ও আলাদা জিআই পেয়েছে। সাদামাটা গরদ মায়ের আলমারির জিনিস মনে হলে এগুলোর একটা নিন। আচার যেমন ছিল তেমনই থাকবে, বদলাবে শুধু মেজাজটা। তবে মায়ের আলমারি থেকে বেরোনো গরদের ভাঁজে যে গন্ধ লেগে থাকে, নতুন শাড়িতে সেটা পাবেন না।

ছেলেদের অষ্টমীর সকাল ধুতির। সরু পাড়ের সাদা ধুতি, সামনে কোঁচা, সাথে হাঁটুর নীচ পর্যন্ত ঘিয়ে তসর বা সিল্কের পাঞ্জাবি। এক কাঁধে সরু লাল পাড়ের ভাঁজ করা চাদর। কবিতায় মধুর বাবাও ধুতি-চাদরই এনেছিলেন, আর গরদের পাশে আজও ওই জুটিই মানায়। গত পুজোর পর আর ধুতি না পরে থাকলে আগের রাতে বাড়িতে একবার পরে দেখে নিন।

অলংকরণ: সরু কালো-সোনালি পাড়ের সাদা ধুতি, হাঁটুর নীচ পর্যন্ত ঘিয়ে তসরের পাঞ্জাবি, এক কাঁধে সরু লাল পাড়ের ভাঁজ করা সাদাটে চাদর আর পায়ে কালো চামড়ার নাগরা পরে দু’হাত জড়ো করে দাঁড়িয়ে এক পুরুষ
অলংকরণ: মুড কলকাতা

অষ্টমীর রাতেও সিল্ক চলে। সকাল সকাল বেরিয়ে থাকলে আর সন্ধেটা ঠান্ডা হলে গরদটাই গায়ে থাক, নয়তো বদলে নিন গাঢ় রঙের সিল্কে। ছেলেদের রাতের পাঞ্জাবি মেরুন বা বোতল-সবুজ সিল্কের। সন্ধিক্ষণে মণ্ডপ থেকে দূরে থাকলে ঢাক রইল নীচে।

৫:০৫

অষ্টমী, পুজোর ঢাক

Saregama Bengali

সারেগামার তোলা অষ্টমীর ঢাক, মিনিট পাঁচেকের। শাড়ির কুঁচি দিতে দিতে চালিয়ে দিন, সময়মতো বেরিয়ে পড়বেন।

পুজো মুডে আরও

নবমীতে পায়ে ব্যথা, ভোগের লাইন লম্বা। দিনে আলমারির সবচেয়ে আরামের সুতিটা পরুন। মেয়েদের হালকা তাঁত বা নরম তসর, ছেলেদের সবচেয়ে কোঁচকানো পাঞ্জাবিটাই। লাইনের শেষে কী অপেক্ষা করছে, সেটা পাবেন আমাদের পুজোর ভোগের লেখায়।

নবমীর রাত বিসর্জনের আগের শেষ গোটা রাত। দিনের আচার মিটে গেছে, ভিড় সবচেয়ে বেশি, তাই ইন্দো-ওয়েস্টার্নের জন্য আমরা এই রাতটাই রাখব। মেয়েদের সাজ সরু সোনালি পাড়ের কালো তাঁত, কুঁচি পরিপাটি, কোমরে অক্সিডাইজড রুপোর পাতলা বেল্ট, ব্লাউজের ওপর ছোট বোনা জ্যাকেট। রাস্তার আলোয় কালো-সোনালি ফোটে, আর সারা দিনের ধুলোও কালোয় ঢাকা পড়ে। তবে আমাদের মতে কালো রাতে ঘোরার রং, মণ্ডপে আচার চলার সময় নয়।

অলংকরণ: কোমরে হাত রেখে দাঁড়িয়ে এক তরুণী, পরনে সরু সোনালি পাড়ের কালো তাঁতের শাড়ি, কোমরে সরু অক্সিডাইজড রুপোর বেল্ট, কালো ব্লাউজের ওপর সোনালি ফুটকির ছোট গাঢ় লাল জ্যাকেট, কানে লম্বা অক্সিডাইজড দুল, পায়ে চটি, পেছনে ফিকে নীল রং
অলংকরণ: মুড কলকাতা

ছেলেদের পরনে থাক ছোট সরষে-হলুদ কুর্তা, সাদাটে ধুতি-ধাঁচের ঢোলা প্যান্ট, ওপরে খোলা গাঢ় সবুজে-নীল কাঁচা সিল্কের হাতকাটা জ্যাকেট। আসলে এ ধুতি-পাঞ্জাবিই, শুধু পোশাকি ভাবটুকু ছেঁটে ফেলা। সারা রাত হাঁটতে এর বেশি কিছু লাগে না। ফেরার ট্যাক্সিতে গল্প শুনতে শুনতে নবমীর রাত শেষ করতে চাইলে নীচে রইল একটা শাড়িরই গল্প।

অলংকরণ: মান্দারিন কলারের ছোট সরষে-হলুদ সুতির কুর্তা, সাদাটে ঢোলা ধুতি-ধাঁচের প্যান্ট, খোলা গাঢ় সবুজে-নীল হাতকাটা জ্যাকেট আর বাদামি চটি পরে দাঁড়িয়ে এক তরুণ, পেছনে ফিকে নীল রং
অলংকরণ: মুড কলকাতা
১৪:৪৩শুনুন: হাড় হিম হরর, চতুর্থ সিজন: নীল শাড়ি

হাড় হিম হরর, চতুর্থ সিজন: নীল শাড়ি

Mirchi Bangla

নিলয় সমীরণ নন্দীর লেখা, মিনিট পনেরোর, মির্চি বাংলার ভয়ের সিরিজ থেকে। অনলাইনে কেনা একটা নীল শাড়ি গায়ে জড়াতেই এক মহিলা পৌঁছে যান হারিয়ে যাওয়া প্রিয় মানুষদের মাঝে। ভয়ের চেয়ে মন কেমন বেশি, নবমীর রাতের মেজাজ তো সেটাই।

▶ এখানে শুনুনYouTube-এ দেখুন · Mirchi Bangla

দশমী, বুধ ২১ অক্টোবর: লালপাড় সাদা আর সিঁদুর খেলা

বুধবার, ২১ অক্টোবর দশমী তিথি থাকছে দুপুর ২টো ১১ পর্যন্ত। সিঁদুর খেলায় মেয়েরা রীতি মেনে লালপাড় সাদা শাড়ি পরেন, প্রায়ই সুতির তাঁত বা গরদ। প্রথা অনুযায়ী খেলাটা বিবাহিত মেয়েদের। সমালোচনাও ওঠে ঠিক সেই কারণে। আপনার মণ্ডপের নিয়মই মেনে চলুন। যা-ই পরুন, সিঁদুরের লাল চিরকালের মতো থেকে গেলেও যেন আফসোস না হয়।

অলংকরণ: বিজয়া দশমীতে হাসিমুখে চল্লিশের কোঠার এক মহিলা, পরনে চওড়া লাল পাড়ের সাদা সুতির শাড়ি, লাল ব্লাউজ, দু’হাতে শাঁখা-পলা, সিঁথিতে সিঁদুর আর গালে সিঁদুরের হালকা ছোপ, হাতে ছোট পেতলের সিঁদুরকৌটো, খালি পা
অলংকরণ: মুড কলকাতা

ছেলেরা আবার সাদা বা ঘিয়েতে ফিরুন: ঘাট অবধি হেঁটে যাওয়ার মতো সুতির পাঞ্জাবি, থাকলে ধুতি। বিসর্জনের পর প্রণাম আর কোলাকুলি। বড়রা ব্র্যান্ডের চেয়ে পরিষ্কার সাদাটাই আগে দেখেন। দেবীবরণ থেকে শান্তিজল, সেদিন কখন কী হয়, সবটা আছে আমাদের দিন ধরে লেখায়।

১০:১০

দশমী, পুজোর ঢাক

Saregama Bengali

দশ মিনিটের দশমীর ঢাক। ঘাটের পথে চালান, আর ঘাট সাত সমুদ্র দূরে হলে বাড়ির সন্ধেয়।

পুজো মুডে আরও

কোন রঙের সাথে কোন রং, আর কেন

  • সাদা আর লাল: আচারের রং, অষ্টমীর সকাল আর দশমীর জন্য। মণ্ডপে এর চেয়ে মানানসই আর কিছু নেই।
  • সরষে-হলুদ আর মেরুন: দিনের জুটি, উষ্ণ অথচ চড়া নয়, ছায়াতেও ছবিতে ভালো আসে।
  • মেরুন আর বোতল-সবুজ: বালুচরী আর সিল্কের সন্ধের জন্য, হলদে আলোয় দুটোই গাঢ় হয়।
  • সাদাটে জমিতে সবুজে-নীল বা মরচে রঙের নকশা: ভোর আর ভ্যাপসা সকালের জন্য, হালকা জমি গায়ে ঠান্ডা রাখে।
  • নীল আর সাদা: ছেলেদের সুতির জুটি, বারবার পরলেও কারও চোখে পড়বে না।
  • কালো আর সোনালি: শুধু নবমীর রাতে। ধুলো ঢাকে, রাস্তার আলোয় ফোটে।

প্রতি শরতে নয় দিনের নয় রঙের যে তালিকা ঘুরে বেড়ায়, সেটা নবরাত্রির। আমাদের মতে বাংলার পুজোয় রঙের নিয়ম আসলে একটাই, অষ্টমী আর দশমীর লাল-সাদা।

ঠাকুর দেখার জুতো

এক রাতের ঠাকুর দেখা মানে এবড়োখেবড়ো রাস্তায়, ভিড়ের মধ্যে, কখনও জল ভেঙে লম্বা হাঁটা। পেছনে স্ট্র্যাপ দেওয়া ফ্ল্যাট, কোলাপুরি বা পায়ে বসে যাওয়া চামড়ার চটি পরুন। হিল পরলে বড়জোর ব্লক হিল, তাও শুধু সপ্তমীর রাতে, আর গাড়ি যদি মণ্ডপের সামনে নামিয়ে আবার তুলে নেয়। অষ্টমীতে নতুন জুতো একদম নয়। অঞ্জলির সময় খুলবেন, তারপর ফোস্কার ওপর আবার পরবেন। ব্যাগে একটা প্লাস্টিকের প্যাকেট রাখুন। মণ্ডপে জুতো ভরে রাখা যাবে, বৃষ্টিতেও কাজে দেবে। কোন মণ্ডপে কোন মেট্রোয় যাবেন, উত্তর কলকাতায় এক সন্ধেয় কোন পথে ঘুরবেন, সবই আছে আমাদের কলকাতার মণ্ডপের লেখায়।

শাঁখা, পলা, সিঁদুর: পরার আগে মানেটা জানুন

ছবিগুলোয় যে সাদা আর লাল চুড়ি, সেগুলো শাঁখা আর পলা। বাংলা উইকিপিডিয়ার শাঁখার পাতা বলছে, শাঁখা তৈরি হয় সামুদ্রিক শঙ্খ থেকে। বিবাহিত বাঙালি হিন্দু মেয়েরা সিঁদুর, নোয়া আর পলার সাথে দু’হাতে শাঁখা পরেন, অনেকের বিশ্বাস, স্বামীর মঙ্গল কামনায়। স্বামী মারা গেলে শাঁখা খুলে ফেলার বা ভেঙে ফেলার প্রথা আছে। তাই বাঙালি বাড়িতে এ কোনও সাজের গয়না নয়। আপনি বিবাহিত না হলে লাল-সাদা কাচের চুড়িতে রংটা পাবেন, মানেটা ধার না করেই। সিঁথির সিঁদুর নিয়েও সেই একই কথা।

বাকি সব নির্দ্বিধায় পরুন: পায়ে আলতা, লাল বা কালো টিপ, খোঁপায় সাদা ফুলের মালা, সোনালি বা অক্সিডাইজড রুপোর দুল। ছেলেদের লাগে একটা ঘড়ি, একটা চাদর বা স্কার্ফ। অঞ্জলির সময় ঝনঝন করে, এমন কিছু না থাকাই ভালো।

খরচ কত: বাজেটের হিসেব

তাঁত মানেই দামি নয়। ৩০ সেপ্টেম্বর রাজ্যের তাঁত সমবায় তন্তুজর বিপণিতে সুতির টাঙ্গাইল ছিল ১,৩৩৪ থেকে ৪,৬২০ টাকায়, শান্তিপুরি ১,৮৯০ থেকে ২,৪৭৮ টাকায়, সুতির জামদানি ২,১৬৩ থেকে ১০,২৯০ টাকায়। গরদ সিল্কের দাম সেখানে ৯,২৬১ থেকে ১৮,০৮১ টাকা, সিল্কের বালুচরীর ১৩,০২০ থেকে ৪৭,২৫০ টাকা। খাদি ও গ্রামোদ্যোগ কমিশনের খাদি ইন্ডিয়ার বিপণিতে সেদিন ফুলহাতা সুতির কুর্তা ১,৩০৭ টাকা, ছোট কুর্তা ৮০৯ টাকা, আর মিহি মসলিনের ধুতি ৯৭২ টাকা। ধুতি অবশ্য সেদিন সব বিক্রি হয়ে গিয়েছিল। দাম বদলায়, কেনার দিন দেখে নেবেন।

হাতে টান থাকলে আমাদের পরামর্শ, টাকাটা ঢালুন একটা গরদে বা একটা ভালো সিল্কের পাঞ্জাবিতে। বাকি পাঁচ দিন সুতি। কলকাতার অক্টোবরও আপনার কাছে ঠিক এটুকুই চায়।

কবিতার শেষে মধু গুপির সাটিনের জামাটা পেয়েও যায়। বুক ফুলিয়ে বাড়ি ফিরে সবাইকে ডেকে বলে, বিধু তো শুধু ছিট পরেছে। রবীন্দ্রনাথ ওখানেই থেমেছেন, আমরাও থামব। মনে রাখার মতো লাইনটা অবশ্য বিধুর: ‘এ কাপড় পছন্দ হয়েছে মোর’। যেটা ভালো লাগে সেটাই পরুন, ঠিক সময়ে। বাকিটা পুজো নিজেই সামলে নেবে।

তথ্যসূত্র (৯)
সদ্য এসেছেগল্পের চ্যানেলে নতুন কী এলসবে যা উঠেছে, বাজে চ্যানেলের নিজের ইউটিউবেই।

মুড কলকাতাকে ফলো করুন

এমন লেখা, নতুন গল্প আর গান এলেই খবর পাবেন।

  1. উৎসব

    দুর্গাপুজো (Durga Puja) ২০২৬: ভিড় এড়িয়ে ঠাকুর দেখা, সপ্তমী থেকে দশমী

  2. উৎসব

    পুজোর বাংলা সিনেমা ২০২৬: হলে কোন ছবি, হইচইতে নতুন কী

  3. উৎসব

    সিঁদুর খেলা আর বিজয়া দশমী ২০২৬: বরণ, খেলা, আর তার পরের সন্ধে

থামানো

হোম স্ক্রিনে MoodKolkata যোগ করুন

  1. ব্রাউজারের বারে শেয়ার-এ চাপুন (উপরে তীর-দেওয়া চৌকো চিহ্ন)।
  2. নীচে নেমে “Add to Home Screen”-এ চাপুন।
  3. “Add”-এ চাপুন। হোম স্ক্রিন থেকে MoodKolkata অ্যাপের মতোই খুলবে।