
কলকাতা
কুমোরটুলি: কলকাতার দুর্গা গড়ার পাড়া, পুজোর আগে কীভাবে যাবেন
কুমোরটুলি কোথায়, কীভাবে যাবেন, কুমোরপাড়াটা আসলে কত পুরোনো, ১৯৪৭-এ ঢাকা থেকে আসা দেবীর কথা, আর শিল্পীদের কাজে বাধা না দিয়ে গলিগুলো কীভাবে ঘুরবেন।
এই লেখায় (৫)
মণ্ডপের নাম আমরা সবাই জানি। পাড়ার পুজো, পাশের পাড়ার পুজো, টিভিতে দেখা বড় পুজো, একেবারে মুখস্থ। কিন্তু যে প্রতিমার সামনে দাঁড়িয়ে অঞ্জলি দিই, তাঁকে কে গড়েছেন, সে নাম কজন জানি?
২০১৪ সালে ইন্দিরা গান্ধী ন্যাশনাল সেন্টার ফর দ্য আর্টস কুমোরটুলির প্রতিমাশিল্পীদের নিয়ে একটা ছবি বানিয়েছিল। ইন্টারনেট আর্কাইভে ছবিটার সাথে একটা বিবরণ রাখা আছে। এঁদের কাজ নিয়ে সেখানে একটাই লাইন: নাম ছাড়াই গড়া, নাম ছাড়াই বিক্রি, তারপর বছরের পর বছর নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া। কুমোরটুলির গলিতে ঢোকার আগে লাইনটা মনে রাখবেন।
উত্তর কলকাতার কুমোরপাড়ার নামই কুমোরটুলি, অনেকে বলেন কুমারটুলি। টুলি বা টোলা মানে পাড়া, তাই নামেই পরিচয়। ইংরেজি উইকিপিডিয়া লিখছে, পাড়াটা রবীন্দ্র সরণি (পুরোনো চিৎপুর রোড) আর গঙ্গার মাঝখানে। একদিকে আহিরীটোলা, অন্যদিকে শোভাবাজার। প্রতি আশ্বিনে এত ছোট একটা পাড়ার দিকে গোটা শহর তাকিয়ে থাকে কেন? আর বয়সই বা তার কত? উত্তর খুঁজতে গেলে পলাশির যুদ্ধের আগের কলকাতায় ফিরতে হয়।
কুমোরটুলি কোথায়, কীভাবে যাবেন
কুমোরটুলি
উত্তর কলকাতা, রবীন্দ্র সরণি আর গঙ্গার মাঝে
পাড়াটা বড় রাস্তা আর নদীর মাঝখানে। তার একটা রাস্তা এখনও বনমালী সরকারের নামে। আঠারো শতকের এই বড়মানুষের বাড়ি ছিল এখানেই। উইকিপিডিয়া বলছে, সবচেয়ে কাছের মেট্রো শোভাবাজার সুতানুটি। উইকিপিডিয়ায় দেওয়া দুটো জায়গার অক্ষাংশ-দ্রাঘিমাংশ ধরলে সোজাসুজি দূরত্ব মোটামুটি ৬০০ মিটার, হাঁটাপথে একটু বেশি। চক্ররেলের শোভাবাজার আহিরীটোলা আর বাগবাজার স্টেশনও কাছে। উইকিপিডিয়ার বাসের তালিকায় আছে ধর্মতলা-দক্ষিণেশ্বরের ৪৩ নম্বরও।
- মেট্রো
- শোভাবাজার সুতানুটি, ব্লু লাইন, যতীন্দ্রমোহন অ্যাভিনিউয়ে
- ট্রেন
- চক্ররেলের শোভাবাজার আহিরীটোলা বা বাগবাজার
- বাস
- ৪৩, ধর্মতলা থেকে দক্ষিণেশ্বর
- টিকিট
- এটা পাড়া, জাদুঘর নয়: গলিতে হাঁটতে টিকিট লাগে না
মেট্রো থেকে বেরিয়ে পশ্চিমে, নদীর দিকে হাঁটুন। চক্ররেল চলে নদীর ধার দিয়েই, তাই শোভাবাজার আহিরীটোলায় নেমে গলিতে ঢুকে পড়লেই হল।
কুমোরটুলি কত পুরোনো?
আমাদের ধারণা, কুমোরটুলি যতটা পুরোনো বলে লোকে ভাবে, আসলে তার চেয়েও পুরোনো। সবচেয়ে ভালো সাক্ষী ১৯০৭ সালে ছাপা একটা বই, এইচ ই এ কটনের ‘ক্যালকাটা ওল্ড অ্যান্ড নিউ’। আঠারো শতকে ইংরেজদের কেল্লার উত্তরে যে ‘নেটিভ টাউন’ গড়ে উঠছিল, কটন তার কথা লিখেছেন। ১৭৪২-এ বর্গির হামলার ভয়ে নদীর ওপার থেকে দলে দলে মানুষ এসে সেই শহর আরও ভরিয়ে তোলে।
শহরটা আসলে ছিল গ্রামের মালা। তার কয়েকটির নাম হয়েছিল প্রথম বাসিন্দাদের পেশা থেকে। কটনের ভাষায়, কুমোরটুলি ছিল কুমোরদের পাড়া। পাশেই মুচিপাড়া, মুচিদের। কলুটোলা, ঘানির কলুদের।
কুমোরটুলির গোড়ার দিকের এক নামী বাসিন্দার খবরও ওই বইয়েই। বনমালী সরকার ছিলেন দেওয়ান, পরে হন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ডেপুটি ট্রেডার। এখানে তিনি বাড়ি তোলেন ১৭৪০ থেকে ১৭৫০ সালের মধ্যে। সে বাড়ির জাঁক এমন ছিল যে সেটা ছড়ায় ঢুকে পড়ে। কটন ছড়াটা রোমান হরফে পুরো ছেপেছেন, বাংলায় যা দাঁড়ায়: ‘বনমালী সরকারের বাড়ি, গোবিন্দরাম মিত্তিরের ছড়ি, আমির চাঁদের দাড়ি, হুজুরিমলের কড়ি, কে জানেন না?’ উইকিপিডিয়া বলছে, বাড়িটা ছিল উনিশ শতক পর্যন্ত। তাঁর নামের রাস্তাটা আজও আছে।
কুমোররা এসেছিলেন কোথা থেকে? বাংলা উইকিপিডিয়া জানাচ্ছে, নদিয়ার নবদ্বীপ, শান্তিপুর আর কৃষ্ণনগর থেকে, নতুন শহরে ভালো রোজগারের আশায়। আমাদের মতে যে পুজোর দৌলতে শহরের আর তাঁদের ছাড়া চলল না, সেটা এল একটু পরে। হাঁটাপথেই শোভাবাজার রাজবাড়ি, আর সেখানে দুর্গাপুজোর বয়স গোনা হয় ১৭৫৭ থেকে। সে বছর পলাশির পর রাজা নবকৃষ্ণ দেব ধুমধাম করে পুজো করেন, অতিথির তালিকায় ছিলেন ক্লাইভও।
বাংলা উইকিপিডিয়া এখানে একটা গল্পও শুনিয়েছে, যদিও তার কোনও পুরোনো সূত্র দেয়নি। গল্পটা বাদ দিতে মন চায় না। সেকালের কুমোররা নাকি সিংহ চোখেই দেখেননি, তাই রাজবাড়ির দুর্গার বাহন হয়েছিল ঘোড়া।
১৭০০
কলকাতার প্রথম কালেক্টর র্যাল্ফ শেলডনের সহকারী হন নন্দরাম সেন, কুমোরটুলির একটা রাস্তা তাঁর নামে (কটন, ১৯০৭, উইকিপিডিয়া অবশ্য নন্দরামকেই প্রথম কর আদায়কারী বলে)
১৭৪০-এর দশক
১৭৪০ থেকে ১৭৫০-এর মধ্যে কুমোরটুলিতে বনমালী সরকারের বাড়ি ওঠে (কটন)
১৭৪২
বর্গির হামলার সময় নদীর ওপারের মানুষ এসে নেটিভ টাউনে ভিড় জমান (কটন)
১৭৫৭
পলাশির পর শোভাবাজারে নবকৃষ্ণ দেবের দুর্গাপুজো
১৯৩৩
কুমোরটুলি সর্বজনীনের পুজো শুরু, প্রতিমা গড়েন গোপেশ্বর পাল (বাংলা উইকিপিডিয়া)
১৯৪৭
দেশভাগের সময় ঢাকেশ্বরী ঢাকা থেকে কলকাতায় আসেন, ১৯৫০-এ কুমোরটুলিতে তাঁর মন্দির ওঠে
২০১৪
কুমোরটুলির প্রতিমাশিল্পীদের নিয়ে আইজিএনসিএ-র ছবি, পরে রজত কমল পায়
ঢাকা থেকে আসা দেবী
যাঁদের পরিবার পূর্ববঙ্গ থেকে এসেছে, কুমোরটুলিতে তাঁদের সবচেয়ে বেশি টানবে কোনও কারখানা নয়, একটা মন্দির। ঢাকেশ্বরী ঢাকার পুরোনো মন্দিরের দেবী। ইংরেজি উইকিপিডিয়ায় কুমোরটুলির পাতা লিখছে, ১৯৪৭-এ দেশভাগের সময় তাঁর বিগ্রহ ঢাকা থেকে কলকাতায় নিয়ে আসা হয়। একই পাতায় অবশ্য সেই উড়ানের সাল লেখা ১৯৪৬।
বিগ্রহটি ছোট, দেড় ফুটের মতো উঁচু। দশ হাত, রূপ কাত্যায়নী মহিষাসুরমর্দিনীর। ১৯৫০ সালে দেবেন্দ্রনাথ চৌধুরী নামে এক ব্যবসায়ী কুমোরটুলিতে তাঁর জন্য মন্দির বানিয়ে দেন।
প্রতি শরতে যে পাড়া নতুন দেবী গড়ে বাইরে পাঠায়, সেই পাড়াই আগলে রেখেছে এক পুরোনো দেবীকে। তিনি এসেছিলেন, আর ফিরে যাননি। সে সময় কলকাতার বহু পরিবার একই পথ ধরে এসেছিল, হয়তো আপনার দাদু-ঠাকুমাও। ১৯৪৭-এর সেই যাত্রীদের খুব কম জনের সামনেই আজ গিয়ে দাঁড়ানো যায়। ঢাকেশ্বরী তাঁদের একজন।
প্রতিমা গড়েন কারা
আইজিএনসিএ-র ছবির বিবরণ বলছে, কুমোরটুলির প্রতিমাশিল্পীরা আদতে জাতে কুমোর, আর তাঁদের ঘিরেই পাড়াটা গড়ে উঠেছিল। পাড়ার নিজের পুজো কুমোরটুলি সর্বজনীন। বাংলা উইকিপিডিয়ার হিসেবে সে পুজো শুরু ১৯৩৩ সালে, প্রতিমাশিল্পী গোপেশ্বর পাল। একই পাতায় আরেকটা হিসেবও আছে: কুমোরটুলিতে মহিলা প্রতিমাশিল্পী প্রায় তিরিশ জন। অথচ আমরা এখনও সবাইকে এক কথায় ‘কুমোর’ বলে ডাকি, আর তাতে এঁদের কথা চাপা পড়ে যায়।
এঁদের হাতের কাজ দূরেও যায়। এ বছর বেঙ্গালুরুর ইলেকট্রনিক সিটির বাঙালি সংগঠন বারসার পুজো নিজেদের পাতায় জানিয়েছে, তাদের প্রতিমা গড়ছেন কুমোরটুলির এক পুরস্কার পাওয়া শিল্পী। বাকিটা পাবেন আমাদের বেঙ্গালুরুর দুর্গাপুজোর লেখায়।
ঘরের কাছে, কুমোরটুলি পার্কের কমিটি ২০২৬-এর থিম করেছে নদীকেই: ‘গঙ্গা তুমি বইছ কেন’। সেপ্টেম্বরের পোস্টে তারা লিখেছিল, গলিতে গলিতে প্রতিমাশিল্পীরা তখন দেবীকে রূপ দিতে ব্যস্ত। আমাদের মণ্ডপের গাইডে উত্তর কলকাতার হাঁটাপথটা শেষ হয় এখানেই, নদীর ধারে।
একটা অনুরোধ রইল। কোনও প্রতিমা ভালো লাগলে জিজ্ঞেস করুন, কার হাতের কাজ। কমিটির নাম নয়। শিল্পীর নাম।
১৬:২০শুনুন: কালী কথা: দেবী দুর্গার নির্মাণকালী কথা: দেবী দুর্গার নির্মাণ
Mirchi Bangla
মির্চি বাংলার ‘টাইমস অফ পুরাণ’-এ জগন্নাথ বসুর গলায় ‘দেবী দুর্গার নির্মাণ’, মিনিট ষোলোর পর্ব। শোভাবাজার অবধি মেট্রোয় শুনতে শুনতে যান, তারপর নিজের চোখে দেখে আসুন মানুষ তাঁকে কীভাবে গড়ে।
পুজোর আগে কুমোরটুলি: কবে যাবেন, কীভাবে ঘুরবেন
এই অংশের তথ্য নীচের সূত্র আর ম্যাপ থেকে নেওয়া, এ বছরের কোনও সফর থেকে নয়। ক্যালেন্ডারের হিসেবটা অবশ্য সোজা। মহালয়া পড়েছে শনিবার, ১০ অক্টোবর ২০২৬, আর পুজোর প্রথম দিন ষষ্ঠী পঞ্জিকাভেদে শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর বা শনিবার, ১৭ অক্টোবর। পুজো শুরুর আগেই প্রতিমাকে মণ্ডপে পৌঁছোতে হয়, তাই আমাদের হিসেবে ষষ্ঠী যত এগিয়ে আসে, তত বেশি তৈরি প্রতিমা চলে যায়। তাই যত আগে যাবেন, তত বেশি ঠাকুর গড়া দেখতে পাবেন।
- দিনের আলো থাকতে যান। এটা কাজের পাড়া, আর কাজ চলে দিনেই।
- কারও ছবি তোলার আগে জিজ্ঞেস করুন, ‘না’ বললে মেনে নিন। কারখানা এখানে রুটিরুজির জায়গা, অনেক সময় বাড়িও।
- ভিতরে না ডাকলে কারখানায় ঢুকবেন না, আধগড়া প্রতিমায় হাতও দেবেন না। কাঁচা মাটিতে দাগ পড়ে যায় সহজেই।
- হালকা হয়ে যান। বড় ক্যামেরার ব্যাগ যে জায়গা নেয়, সেটা আসলে যাঁরা কাজ করছেন তাঁদের জায়গা।
- হাতে গোটা একটা সকাল রাখুন। রাজা নবকৃষ্ণ স্ট্রিটের শোভাবাজার রাজবাড়ি হেঁটেই যাওয়া যায়, গঙ্গাও।
ফেরার আগে একবার ঘাটে নেমে দাঁড়াবেন। কটনের বইয়ের কুমোররা যবে থেকে এখানে বসত গেড়েছেন, এই নদী তবে থেকেই কুমোরটুলির পাশ দিয়ে বইছে। এইমাত্র যে দেবীদের গড়ে উঠতে দেখলেন, দশমীর পর তাঁরা ফিরবেন এই জলেই। ছবির বিবরণের সেই লাইনটা তখন মনে পড়বে: নাম ছাড়াই গড়া, বছরের পর বছর নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া। এখানে দাঁড়িয়ে লাইনটা আর নালিশের মতো শোনায় না। মনে হয়, শহর একটা খুব পুরোনো কথা রেখে চলেছে।
তথ্যসূত্র (৮)
- Kumortuli, উইকিপিডিয়া (ইংরেজি)। দেখা হয়েছে ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬।
- কুমারটুলি, উইকিপিডিয়া। দেখা হয়েছে ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬।
- ক্যালকাটা ওল্ড অ্যান্ড নিউ, এইচ ই এ কটন (১৯০৭), ইন্টারনেট আর্কাইভ। দেখা হয়েছে ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬।
- ডকুমেন্টেশন অফ ক্লে ইমেজ মেকার্স অফ কুমারটুলি (আইজিএনসিএ, ২০১৪), ইন্টারনেট আর্কাইভ। দেখা হয়েছে ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬।
- 62nd National Film Awards, উইকিপিডিয়া (ইংরেজি)। দেখা হয়েছে ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬।
- Shobhabazar Rajbari, উইকিপিডিয়া (ইংরেজি)। দেখা হয়েছে ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬।
- Durga Puja in Kolkata, উইকিপিডিয়া (ইংরেজি)। দেখা হয়েছে ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬।
- Sovabazar Sutanuti metro station, উইকিপিডিয়া (ইংরেজি)। দেখা হয়েছে ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬।
মুড কলকাতাকে ফলো করুন
এমন লেখা, নতুন গল্প আর গান এলেই খবর পাবেন।


