
উৎসব
কোজাগরী লক্ষ্মীপুজো ২০২৬: কবে, কোন রাতে, আর বাঙালি বাড়িতে কীভাবে হয়
কলকাতায় কোজাগরী লক্ষ্মীপুজো এ বছর রবিবার, ২৫ অক্টোবর রাতে। কেন ওই রাত, ‘কোজাগরী’ নামের মানে কী, আর বাঙালি বাড়িতে দেবীর জন্য কী কী সাজানো হয়।
এই লেখায় (৫)
এ বছর কোজাগরী লক্ষ্মীপুজো রবিবার, ২৫ অক্টোবর রাতে। পুজো তখন চার দিন আগের কথা। ঢাক থেমে গিয়েছে। দশমীতে যিনি বিদায় নিলেন, তিনি রেখে গিয়েছেন মেয়েকে। বাঙালি হিন্দুর বিশ্বাসে লক্ষ্মী দুর্গারই মেয়ে, ইংরেজি উইকিপিডিয়ায় লক্ষ্মীর পাতাতেও তা-ই লেখা। বিসর্জনের পরের ক’দিন শহরটা কেমন ফাঁকা ফাঁকা লাগে। সেই ফাঁকা সময়ের পূর্ণিমায় মেয়ের পুজো হয় মণ্ডপে নয়, বাড়ির মেঝেয়। মা এসেছিলেন শহরের অতিথি হয়ে, ভিড় আর ঢাকের মাঝে। মেয়েকে ঘরে তোলে সংসার, রাত জেগে।
কোজাগরী লক্ষ্মীপুজো ২০২৬ কবে?
কলকাতায় কোজাগরী লক্ষ্মীপুজো ২০২৬ পড়েছে রবিবার, ২৫ অক্টোবর। দৃকপঞ্চাঙ্গের কলকাতার হিসেবে আশ্বিনের পূর্ণিমা তিথি লাগছে রবিবার, ২৫ অক্টোবর বেলা ১১টা ৫৫ মিনিটে, ছাড়ছে সোমবার, ২৬ অক্টোবর সকাল ৯টা ৪১ মিনিটে। চাঁদ উঠছে রবিবার বিকেল ৪টে ২১ মিনিটে। নিশীথ মানে মাঝরাত, আর নিশীথ পুজোর সময় রবিবার রাত ১০টা ৫৬ মিনিট থেকে ১১টা ৪৬ মিনিট।
তিথি তো দু’দিনই ছুঁয়ে আছে, তবে সোমবার নয় কেন? কারণ এ পুজো সন্ধের। বাংলা উইকিপিডিয়া লিখছে, কোজাগরী পুজোর প্রকৃষ্ট সময় প্রদোষ, সূর্য ডোবার পরের দু’ঘণ্টা। নিয়মটাও সেখানে আছে: আগের দিনের প্রদোষে তিথি থাকলে আর পরের দিনের প্রদোষে না থাকলে পুজো হবে আগের দিনেই। এ বছর সোমবার সকালেই তিথি ছেড়ে যাচ্ছে। তিথি-সমেত প্রদোষ তাই পাচ্ছে শুধু রবিবারের সন্ধে। বাড়ির পঞ্জিকা বা পুরোহিতমশাই ২৬ তারিখ ধরলে অবশ্য তাঁদের কথাই শেষ কথা।
কোজাগরী নিশীথ পুজো শুরু (কলকাতায় রাত ১০টা ৫৬ মিনিট)
- কলকাতারবি২২:৫৬২৫ অক্টো
- ঢাকারবি২৩:২৬২৫ অক্টো
- লন্ডনরবি১৭:২৬২৫ অক্টো
- নিউ ইয়র্করবি১৩:২৬২৫ অক্টো
- বেঙ্গালুরুরবি২২:৫৬২৫ অক্টো
দৃকপঞ্চাঙ্গে কলকাতার নিশীথ পুজোর সময়, রবিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬। বাংলা উইকিপিডিয়ার মতে পুজোর প্রকৃষ্ট সময় সূর্য ডোবার পরের দু’ঘণ্টা। পরের এই সময়টা রাত-জাগা মানুষদের জন্য।
কোজাগরী: কে জেগে আছ?
নামটাই একটা প্রশ্ন। ‘কো জাগর্তি’, মানে কে জেগে আছ? বিশ্বাস, এই পূর্ণিমার রাতে লক্ষ্মী ঘরে ঘরে ঘোরেন, আর যেখানে কাউকে জেগে থাকতে দেখেন, সেখানেই আশীর্বাদ রেখে যান। রাত জাগার এই রীতির কথা দৃকপঞ্চাঙ্গে আছে, ইংরেজি উইকিপিডিয়াতেও। বাংলা উইকিপিডিয়া আরও এক ধাপ এগিয়ে তুলে দিয়েছে একটা সংস্কৃত শ্লোক: ‘নিশীথে বরদা লক্ষ্মীঃ জাগরত্তীতিভাষিণী’। মাঝরাতে ঘুরতে বেরিয়ে দেবী কথা দিচ্ছেন, যে জেগে পাশা খেলছে, তাকেই ধন দেবেন। ভদ্র বাড়ির ছেলেমেয়েদের একটু চমকে দেওয়ার মতো একটা রীতিও ওই পাতায় আছে। কেউ কেউ এই রাতে পরের বাগানের ফল চুরি করেন। বিশ্বাস, তাতে লক্ষ্মী খুশিই হন।
আমাদের অবশ্য উত্তরের চেয়ে প্রশ্নটাই বেশি ভালো লাগে। ওই পাতাতেই একটা চলতি কথা আছে। যার কিছু নেই, সে জাগে পাওয়ার আশায়। আর যার আছে? সে জাগে হারানোর ভয়ে। সংসারের টাকাপয়সা নিয়ে এর চেয়ে সৎ হিসেব আমরা আর শুনিনি।
বাঙালি বাড়িতে কোজাগরী যেভাবে হয়
শুরু মেঝে থেকে, ভেজা চালবাটায় ডোবানো আঙুলে। বাংলা উইকিপিডিয়া বলছে, এই রাতের সাদা আলপনায় থাকে ধানের ছড়া, মুদ্রা আর মা লক্ষ্মীর পায়ের ছাপ। ঘরের ভেতরে আঁকা এমন নকশা বোঝায় যে লক্ষ্মী ঘরে ঢুকেছেন, আলপনা নিয়ে ইংরেজি উইকিপিডিয়া লিখছে। লক্ষ্মীর পা অবশ্য গোটা বাংলার আলপনারই চেনা নকশা, আলপনা নিয়ে বাংলা উইকিপিডিয়ার আলাদা পাতাটাও সেটাই বলে। সারা বছর যা শুধু নকশা, কোজাগরীর রাতে তা-ই পথ দেখায়।
কোন বাড়িতে দেবী কীসে বসবেন, সেটা বলে দেয় পরিবারের শিকড় কোথায়। বাংলা উইকিপিডিয়া যেন একটা গোটা তাক সাজিয়ে দিয়েছে। ছাঁচে গড়া মাটির মূর্তি। পূর্ববঙ্গের রীতিতে সরার পট। সরারও আবার ঘরানা আছে, ঢাকাই, ফরিদপুরি, সুরেশ্বরী, শান্তিপুরী, আর সে সরা আজও আঁকা হয় নদিয়ার তাহেরপুর আর নবদ্বীপে, উত্তর চব্বিশ পরগনাতেও। লাল চেলিতে মোড়া ধানের চুপড়ি, আড়ি লক্ষ্মী। কলার বাকলের ন’টা চোঙায় শস্য ভরে কলার বের। লক্ষ্মীর মুখ-আঁকা পোড়ামাটির ঘট। আর সপ্ততরী: কলার পেটো কেটে বানানো ছোট ছোট নৌকো, চাল, ডাল, কড়ি, হলুদ বোঝাই। বাণিজ্যের দেবীর জন্য বাণিজ্যের নৌকো।
বাংলা উইকিপিডিয়াও প্রায় সেটাই বলছে: পুজোর উপকরণ দেখলে পিছনের কৃষি সমাজটা চেনা যায়। তাকের রূপগুলোয় আরেকবার চোখ বোলালে কথাটা আরও স্পষ্ট হয়। ধানের চুপড়ি, শস্যে ভরা কলার বের, চাল-ডাল বোঝাই নৌকো, সবই আসলে ভাঁড়ার। লক্ষ্মীর পুজোও বছরে একবারের ব্যাপার নয়। ওই পাতাই লিখছে, বাড়িতে প্রতি বৃহস্পতিবার লক্ষ্মীর পাঁচালি পড়া হয়, আর বছরের ফসল-বদলের দিনগুলোয়, ভাদ্র, পৌষ আর চৈত্র সংক্রান্তিতে, পুজো ফিরে আসে। পেঁচা কেন বাহন, তার উত্তরও ওই পাতায় চাষির যুক্তিতে: ধান মানে লক্ষ্মী, ধান খায় ইঁদুর, ইঁদুর খায় পেঁচা। মণ্ডপের দেবী বছরে একবার আসেন, ক’দিন থেকে ফিরে যান। লক্ষ্মীকে বাঙালি সংসার ঘরে রেখে দেয় সারা বছর, বৃহস্পতিবারের পাঁচালিতে, ফসল তোলার দিনে, ধানের চুপড়িতে। কোজাগরীর রাতে সেই সংসার তাঁর জন্য জেগে বসে থাকে, ঠিক যেমন জাগে যার কিছু হারানোর আছে।
থালায় কী থাকে
ভোগের থালায় এসে পূর্ববঙ্গ আর পশ্চিমবঙ্গের পথ আলাদা হয়ে যায়। বাংলা উইকিপিডিয়ার বিবরণে, অনেক বাড়িতেই ভোগে থাকে জোড়া ইলিশ, আর পূর্ববঙ্গীয় রীতিতে এদিন রান্না হয় মাছের পাঁচ পদ। পশ্চিমবঙ্গীয় রীতিতে আবার দিনটা পুরো নিরামিষ, উনুনে ভাতও চড়ে না। খিচুড়ি আর লাবড়া থাকতেই হবে, ওই পাতার কথায়। আর যা নিয়ে কোনও বাড়িতেই তর্ক নেই: নারকেলের নাড়ু, তিলের নাড়ু, লুচি, পায়েস। এই পাতার মাথার ছবিটা ২০১৭-য় হাওড়ার এক বাড়িতে তোলা। লুচি, নাড়ু, ফল, সব সাজানো হয়ে গিয়েছে, অপেক্ষা শুধু পুজোর। পুজোর ক’দিনের থালা নিয়ে লিখেছি আমাদের দুর্গাপুজোর ভোগের লেখায়।
- আলপনাটা পুজোর আগেই এঁকে ফেলুন, পায়ের ছাপ যেন ঘরের দিকে হেঁটে ঢোকে।
- এ বছর পুজো সন্ধের: রবিবার, ২৫ অক্টোবর, সূর্যাস্তের পরে।
- রাত জাগবেন? নিশীথ পুজোর সময় রাত ১০টা ৫৬ মিনিট থেকে ১১টা ৪৬ মিনিট। চাঁদ উঠে গিয়েছে বিকেল ৪টে ২১ মিনিটেই।
- বাড়ি থেকে দূরে থাকলে ওপরের ঘড়িটা দেখে নিন, নিশীথ পুজোর সময় সেখানে আপনার শহরের হিসেবে দেওয়া আছে।
যে রাতে জেগে থাকাই নিয়ম
নীচের গল্পগুলো পুজো মিটে যাওয়ার পরের প্রহরগুলোর, গানগুলো চাঁদের। প্রথম দুটো একই রবীন্দ্রসঙ্গীত। বসন্তের গান, অথচ মনে হয় এই রাতের জন্যই লেখা। জ্যোৎস্নায় সবাই বনে গিয়েছে, গায়ক যাবেন না, ঘরেই থেকে যাবেন। কেন, সেটা বলছেন গানের মাঝখানে: ‘আমার এ ঘর বহু যতন ক’রে / ধুতে হবে মুছতে হবে মোরে। / আমারে যে জাগতে হবে, কী জানি সে আসবে কবে’। ঘর ধোয়া-মোছা, রাত জাগা, কে কখন আসবেন তার অপেক্ষা। তিন লাইনে গোটা কোজাগরী।
৪:০৩আজ জ্যোৎস্নারাতে
SVF Music
নাম আছে মধুবন্তী আর অম্লানের, ‘সিক্স’ সিরিজের জন্য, ২০১৮-য় বের করেছিল এসভিএফ মিউজিক। মিনিট চারেকের গান।
৪:২২আজ জ্যোৎস্নারাতে
Asha Audio
একই গান কৌশিক চক্রবর্তী আর প্রজ্ঞার গলায়, ২০২৬-এ বের করেছে আশা অডিও।
৩:০০পূর্ণিমা সন্ধ্যায়
Zee Music Bangla
লগ্নজিতা চক্রবর্তীর গলায়, ‘সেদিন কুয়াশা ছিল’ নামে জি মিউজিক বাংলার ২০২৪-এর রিলিজ থেকে। তিন মিনিটের গান, পূর্ণিমার সন্ধেটার জন্য তুলে রাখুন।
১৭:০৬শুনুন: কালী কথা: কোজাগরীর অজানা তথ্যকালী কথা: কোজাগরীর অজানা তথ্য
Mirchi Bangla
মির্চি বাংলার ‘টাইমস অফ পুরাণ’, ১৬ নম্বর পর্ব: নাম যেমন বলছে, সতেরো মিনিটে কোজাগরীর অজানা কিছু কথা। পরের দুটো পর্বও লক্ষ্মীকে নিয়েই।
৪৮:০৩শুনুন: মহামায়ার গল্প: লক্ষ্মীর আবির্ভাবমহামায়ার গল্প: লক্ষ্মীর আবির্ভাব
Mirchi Bangla
লক্ষ্মীর আবির্ভাবের গল্প শোনায় মির্চি বাংলার টাইমস অফ পুরাণ, মিনিট আটচল্লিশ ধরে। ইংরেজি উইকিপিডিয়া একটা বিশ্বাসের কথা লিখছে: সমুদ্রমন্থন থেকে লক্ষ্মী উঠে এসেছিলেন এই পূর্ণিমাতেই।
৪৫:৩৪শুনুন: বৈকুণ্ঠর লক্ষ্মীলাভবৈকুণ্ঠর লক্ষ্মীলাভ
Akashvani Kolkata
প্রসাদ খাওয়ার পরের জন্য একটা হাসির গল্প, আকাশবাণী কলকাতার, পঁয়তাল্লিশ মিনিটের। নাম শুনেই বোঝা যায়, বৈকুণ্ঠ নামের এক ভদ্রলোকের কপালে লক্ষ্মীলাভ আছে। বাকিটা গল্পের জন্যই তোলা থাক।
গল্প ফুরোলে পুজোর মুডে মরসুমের গান এখনও চলছে, আর রবীন্দ্রসঙ্গীতের মুডে আরও জ্যোৎস্না। পুজোর ক’দিন বাইরে থাকায় গানগুলো যদি শোনা না হয়ে থাকে, আমাদের দুর্গাপুজোর গানের লেখাটা খুলে বসুন।
তথ্যসূত্র (৭)
- কোজাগরী পুজো ২০২৬, কলকাতা, দৃকপঞ্চাঙ্গ। দেখা হয়েছে ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬।
- শারদ পূর্ণিমা (Sharada Purnima), উইকিপিডিয়া (ইংরেজি)। দেখা হয়েছে ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬।
- কোজাগরী লক্ষ্মীপূজা, বাংলা উইকিপিডিয়া। দেখা হয়েছে ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬।
- লক্ষ্মী (Lakshmi), উইকিপিডিয়া (ইংরেজি)। দেখা হয়েছে ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬।
- আলপনা, বাংলা উইকিপিডিয়া। দেখা হয়েছে ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬।
- আলপনা (Alpana), উইকিপিডিয়া (ইংরেজি)। দেখা হয়েছে ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬।
- আজ জ্যোৎস্নারাতে সবাই গেছে বনে (গীতবিতান, পূজা ১৪৬), বাংলা উইকিসংকলন। দেখা হয়েছে ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬।
ছবি: হাওড়ার এক পরিবারের কোজাগরী লক্ষ্মীপুজো, ৫ অক্টোবর ২০১৭, পুজোর জন্য সাজানো আয়োজন।: Biswarup Ganguly, Wikimedia Commons, CC BY 3.0, cropped
সদ্য এসেছেগল্পের চ্যানেলে নতুন কী এলসবে যা উঠেছে, বাজে চ্যানেলের নিজের ইউটিউবেই।গল্পগুলো দেখুনমুড কলকাতাকে ফলো করুন
এমন লেখা, নতুন গল্প আর গান এলেই খবর পাবেন।


